দুই প্রতিবেশীর বাণিজ্য যুদ্ধ আরও তীব্র হয়েছে। কানাডা মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করার পরই দেশটির মদ, দুগ্ধজাত পণ্য ও মোটরসাইকেলসহ একঝাঁক পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করছে যুক্তরাষ্ট্র।
মঙ্গলবার একগুচ্ছ নির্বাহী আদেশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বৈষম্যমূলক আচরণ’ করছে। এর পরই কানাডার থেকে আমদানি করা বেশকিছু পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞার রূপরেখা তুলে ধরা হয়। আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
এর আগে একই দিনে এক ভিডিও বার্তায় কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেন, বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্যদিকে কানাডার ঝুঁকে পড়ার সিদ্ধান্তের ‘মূল্য দিতে হবে’।
হোয়াইট হাউস কানাডার যেসব পণ্য নিষিদ্ধ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে— হুইয়ের মতো দুগ্ধজাত পণ্য, আখের গুড়, অ্যালকোহলমুক্ত বিয়ার, ওয়াইন, রাম ও ভদকার দীর্ঘ তালিকা, বার্লি বা মল্ট থেকে তৈরি বিয়ার ও মপেডসহ নানা ধরনের মোটরসাইকেল।
আর যেসব পণ্যের ওপর উচ্চ আমদানি কর আরোপ করা হয়েছে— বিভিন্ন ধরনের পনির, প্রক্রিয়াজাত না করা চামড়া, কাগজ, কিছু আসবাবপত্র ও তোশক, অ্যালুমিনিয়াম ও লোহাসহ কিছু ধাতু, মোটরবোট, গলফ কার্ট, মাছ ধরার ছিপের যন্ত্রাংশ ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম ও সুইচবোর্ড।
বিবিসির প্রতিবেদনে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কর্মকর্তারা নতুন এক বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে গত আগস্টের শেষের দিকে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর থেকে নতুন করে কোনো আলোচনার দিনক্ষণ ঠিক হয়নি।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য কানাডার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
হোয়াইট হাউসের নতুন নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা বাণিজ্যযুদ্ধের সর্বশেষ পদক্ষেপ। ঐতিহাসিকভাবে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।
সাধারণত কানাডার মোট রপ্তানির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি যায় প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রে। অন্যদিকে, মেক্সিকোর পর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার কানাডা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কানাডার রপ্তানি অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়।
সীমান্তের দুই পাশের ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, পণ্যের দাম বাড়বে এবং ক্রেতার সংখ্যা কমবে।
গত মাসে কয়েক দফা আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর হোয়াইট হাউস কানাডার প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে। ওই শুল্কের কারণে কানাডার আসবাবপত্র ও ওয়াইন শিল্পের পাশাপাশি ক্রীড়া ও মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরির কারখানাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এর জবাবে কানাডাও মার্কিন ইস্পাত, পোশাক ও আসবাবপত্রের মতো পণ্যের ওপর সমান অনুপাতে (ডলারের বিপরীতে ডলার) পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর থেকেই এই পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
মঙ্গলবার নতুন আমদানি বিধিনিষেধের ঘোষণাকালে হোয়াইট হাউস জানায়, কানাডা অন্য দেশের পণ্যে ছাড় দিয়ে মার্কিন পণ্যে কড়াকড়ি আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসার সঙ্গে ‘বৈষম্যমূলক আচরণ’ করছে।
নতুন করে কিছু পণ্য, যেমন হুই (দুগ্ধজাত ছানার পানি) ও অ্যালকোহলমুক্ত বিয়ারের ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে পনির ও মোটরবোটসহ অন্যান্য কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক আরও বাড়ানো হয়েছে।
সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও বাণিজ্য বিধিনিষেধের ইঙ্গিত দিয়ে কানাডীয় বিমান প্রস্তুতকারক সংস্থা বম্বার্ডিয়ারকে সতর্ক করেন। তিনি জানান, উৎপাদন কারখানা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর না করলে তারা সেখানে আর পণ্য বিক্রি করতে পারবে না।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে শুল্ক সহায়ক হবে বলে দীর্ঘদিন ধরে মনে করেন ট্রাম্প। তবে তাঁর বিস্তৃত পরিসরের এই শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অনেক পুরোনো মিত্রদের ক্ষুব্ধ করেছে।
গত বছর ট্রাম্প বৈশ্বিক শুল্ক অভিযান শুরু করার পর থেকে কিছু কানাডীয় নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্য, বিশেষ করে মদজাতীয় পানীয় বয়কটের বড় ধরনের প্রচারণা চালিয়েছেন। যার ফলে কানাডার দোকানগুলোর তাক থেকে বহু মার্কিন পণ্য হাওয়া হয়ে যায়।
হিনরিচ ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ডেবোরা এলমস বিবিসিকে বলেন, মার্কিন ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল যেকোনো কানাডীয় ব্যবসায়ের ওপর এই আমদানি নিষেধাজ্ঞার ‘ভারী প্রভাব’ পড়তে পারে। তবে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এর প্রভাব তুলনামূলক ‘সীমিত’ হতে পারে এবং প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য এতে প্রভাবিত হবে।
এলমস আরও বলেন, কানাডা সম্ভবত ‘আপাতত আগের অবস্থান ধরে রাখবে’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ পদক্ষেপ মোকাবিলায় তারা নিজস্ব ব্যবসা সহায়তা খাত পুনর্নির্ধারণ করবে।
তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে বসাতে কী পদক্ষেপ লাগবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই ঘোষণাগুলোর ভাষা কিন্তু আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার পক্ষে খুব একটা সহায়ক নয়।’