চলতি মাসের শেষের দিকে নিজের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। বুধবার (১২ আগস্ট) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে নিজের অন্যতম বিশ্বস্ত এই উপদেষ্টাকে হারাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।
তবে দায়িত্ব ছাড়লেও ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয় থেকে একেবারে সরে যাচ্ছেন না লেভিট। ট্রাম্প ও লেভিট—উভয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, লেভিট হোয়াইট হাউসের বাইরে থেকে যোগাযোগ উপদেষ্টা (এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস অ্যাডভাইজার) এবং ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে দলীয় সংগঠক হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ২৮ বছর বয়সী লেভিট জানান, তিনি তাঁর শিশুদের আরও বেশি সময় দিতে চান। গত মে মাসে তিনি এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন এবং সম্প্রতি মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজ যোগ দিয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেভিটের প্রশংসা করে লেখেন, ‘২০১৮ সাল থেকে ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও মুক্ত চিন্তার পক্ষে লড়াইয়ে ক্যারোলিন হোয়াইট হাউসে একজন প্রকৃত নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২৪ সালে আমাদের প্রচারণাতেও তিনি অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছেন।’ লেভিটকে ‘হোয়াইট হাউসের ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্রেস সেক্রেটারি]’ হিসেবেও অভিহিত করেন ট্রাম্প।
অন্যদিকে, হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনের এই সময়টিকে ‘জীবনের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা’ বলে বর্ণনা করেছেন লেভিট।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে মনোনীত হওয়ার আগে লেভিট ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হন এবং পরবর্তী সময়ে মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব সামলান। তিনি মার্কিন ইতিহাসে হোয়াইট হাউসের সর্বকনিষ্ঠ প্রেস সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত হন।
প্রায় দেড় বছরের দায়িত্ব পালনকালে লেভিট এবং হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং সংবাদমাধ্যমের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁদের এই পদক্ষেপকে ট্রাম্পের মিত্ররা স্বাগত জানালেও মুক্ত সংবাদমাধ্যমের সমর্থকেরা কড়া সমালোচনা করেছিলেন।
প্রথাগত ঐতিহ্য ভেঙে ট্রাম্প প্রশাসন প্রেসিডেন্টের কাছে কোন কোন সাংবাদিক সরাসরি পৌঁছাতে পারবেন তা নিজেরা বাছাই করা শুরু করে। ফলে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’-এর দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ‘প্রেস পুল’ ব্যবস্থা থেকে প্রশাসন সরে আসে। মূলত ছোটখাটো ইভেন্টে সব গণমাধ্যমের সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ও জনস্বার্থে তথ্য পৌঁছে দিতে এই প্রেস পুল ব্যবস্থা পরিচালিত হতো।
এই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে, ট্রাম্প প্রশাসনের প্রেস অফিস ব্রিফিং রুমে গণমাধ্যমের জন্য বিশেষভাবে কিছু আসন বরাদ্দ করে। এতে পডকাস্ট, নিউজলেটার ও নতুন ডিজিটাল আউটলেটগুলোকে প্রেসিডেন্সি কাভারেজের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিষয়টিকে কেউ কেউ স্বাগত জানালেও, সমালোচকদের মতে এই সুযোগকে ট্রাম্প প্রশাসন তাঁদের অনুগত সংবাদমাধ্যমগুলোকে পুরস্কৃত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
চলতি সপ্তাহে মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনার মধ্যেই লেভিটের এই পদত্যাগের ঘোষণা এল। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, গত জুলাই মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলন শেষে ফিরে আসার সময় ট্রাম্প নিজের মন্ত্রিসভার সদস্য, কর্মী এবং সাংবাদিকদের বহনকারী বিমানকে ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের সম্ভাব্য গুপ্তহত্যার হুমকির মুখে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকের পেছনের অংশে লুকিয়ে এক বিমান থেকে গোপন অন্য একটি বিমানে (সি-৩২) সরিয়ে নেয়। কিন্তু মূল বিমানে থাকা সাংবাদিক কিংবা সাধারণ কর্মীরা বিষয়টি টেরই পাননি।
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের সফর সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের প্রথা বা নিয়ম নিয়ে সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ইরানের সম্ভাব্য হামলার কথা জেনে প্রেসিডেন্ট নিজেকে বাঁচিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু ওই বিমানে যে আরও অনেকেই ছিলেন তাদের কথা ভাবেননি।
প্রশ্ন হতে পারে, এর সঙ্গে লেভিটের পদত্যাগের সম্পর্ক কী। এর সঙ্গে লেভিটের পদত্যাগের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে অনেকেই বলছেন, তুরস্কে বিমান নিয়ে বিতর্কের ঘটনাটি অত্যন্ত গোপণ ছিল। কিন্তু এরপরও বিষয়টি গণমাধ্যমে আসায় চটেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। যেহেতু লেভিট হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং সামলেছেন সেহেতু, এর দায় তাঁর ওপরেই পড়ে। আর এর জেরেই হয়তো তাঁকে পদত্যাগ করতে হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স