হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

নতুন নিষেধাজ্ঞায় ইরানকে ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ’ করার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ছবি: এএফপি

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়ে দেশটিকে ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ’ করার অঙ্গীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, তেহরানের শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার প্রতিটি অর্থনৈতিক পথ বিচ্ছিন্ন করাই এবার ওয়াশিংটনের লক্ষ্য। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযানে যোগ না দেওয়া দেশগুলোকেও ইরানের মতো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বেসেন্ট এ ঘোষণা দেন। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ যখন অচলাবস্থায় আটকে আছে, শান্তি আলোচনা স্থবির এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এখনো বহাল—ঠিক সেই সময়েই এই নতুন অর্থনৈতিক চাপের ঘোষণা এল।

এর আগে বেসেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ ঘোষণার কথা বলেছিলেন। তবে সোমবারের ঘোষণায় কোনো নির্দিষ্ট দেশের নাম বা নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো, ইরানের এই স্বৈরাচারী শাসনকে টিকিয়ে রাখে বিশ্বজুড়ে এমন প্রতিটি অর্থনৈতিক পথ বিচ্ছিন্ন করা, যতক্ষণ না তারা একা হয়ে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনব। এটি হচ্ছে এই শাসনব্যবস্থাকে অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ করার অভিযান।’

বেসেন্টের দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান জানাচ্ছেন।

ইরানের যেসব খাত নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায়

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, সম্প্রসারিত সেকেন্ডারি স্যাংশনের আওতায় ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে লক্ষ্য করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—ডিজিটাল সম্পদ (ক্রিপ্টোকারেন্সি), প্রযুক্তি খাত, স্বর্ণ ব্যবসা, বেসামরিক বিমান চলাচল, জাহাজ ও শিপিং খাত।

বেসেন্ট বলেন, ‘ইরানের পক্ষে অর্থ পাচারে সহায়তাকারী যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।’

ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া

এদিকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হুমকিকে সামরিক ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি বলে মন্তব্য করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই তার লক্ষ্য অর্জন করে থাকে, তাহলে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আর্থিক অভিযান’ চালানোর প্রয়োজন কেন? যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ও শক্তিকে আবার কেন একত্রিত করা হচ্ছে?

গারিবাবাদি বলেন, ‘এটি কি বিজয়, নাকি আমেরিকার পরাজয়ের স্বীকারোক্তি?’ তিনি অন্য দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের এই অর্থনৈতিক অভিযানে সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান।

তেল রপ্তানিতে বড় ধাক্কা

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কারণ হিসেবে তুলে ধরলেও, যুদ্ধের বাড়ার সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক এই জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হতো।

যুদ্ধ শুরুর পর তেহরান প্রথমবারের মতো হরমুজে অবরোধ আরোপ করে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বাড়ায় নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বেড়েছে।

সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌ অবরোধের কারণে হরমুজ দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেল থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে নেমে এসেছে মাত্র ৪ লাখ ব্যারেলে।

চীনা ব্যাংকও কি নিশানায়

যুদ্ধের আগে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান প্রতিদিন কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি করত। এর বড় অংশই যেত চীনে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, তেহরান মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে গেছে।

সোমবার সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক জানতে চান, নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় চীনের বড় ব্যাংকগুলোও আসতে পারে কি না। জবাবে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বাইরে কেউ নয়।’

ইরানের অভ্যন্তরে বাড়ছে চাপ

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিকে গুরুত্ব না দিয়ে এক্সে লিখেছেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র এমন অবস্থানে নেই যে, অন্য দেশগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও সীমিত করতে পারবে।’

তবে সাধারণ ইরানিদের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে একাধিক গণবিক্ষোভ হয়েছে। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির বিক্ষোভও মূলত অর্থনৈতিক সংকট থেকেই শুরু হয়েছিল।

তেহরানের ৩২ বছর বয়সী ফার্মাসিস্ট সারা হাসানবেইগি এএফপিকে বলেন, ‘আমার মনে হয় না, মানুষ আর খুব বেশি দিন এভাবে টিকে থাকতে পারবে।’

কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত

গত সপ্তাহে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছিলেন, ‘আমরা এখন শক্ত অবস্থানে আছি। তাই যুদ্ধের ইতি টানার সময় এসেছে।’

এর কিছুদিন আগে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদে কট্টরপন্থী নেতাদের নিয়োগ দেন।

যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশের উদ্যোগে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চলছে। সোমবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফরে গিয়ে স্পিকার গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতিতে ইসলামাবাদ গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী ছিল। পাশাপাশি পাকিস্তান ইরানের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতেও রয়েছে।

অন্যদিকে, ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মঙ্গলবার তেহরান সফরের কথা রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন সমঝোতার লক্ষ্যে মাসকাট ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে।