ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণাদায়ক দিন পার করছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তাঁর ছোট ছেলে হান্টার বাইডেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বাবার ক্যানসারের বিষয়ে নতুন তথ্য জানিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই সাক্ষাৎকারে বাইডেনের প্রেসিডেন্ট থাকার সময়কার কিছু বিতর্কিত ঘটনাও তুলে ধরেছেন তাঁর ছেলে।
গত শুক্রবার রাতে বিবিসির ‘নিউজনাইট’ অনুষ্ঠানে উপস্থাপক প্যাডি ও’কনেলের সঙ্গে আলাপকালে হান্টার বাইডেন জানান, তাঁর বাবার বর্তমান শারীরিক অবস্থা খুবই দুর্বিষহ। ক্যানসার তাঁকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
হান্টার বাইডেন বলেন, ‘এটা সত্যিই খুব কঠিন। তাঁকে এভাবে কষ্ট পেতে দেখা সত্যিই দুঃখজনক।’
হান্টার আরও বলেন, ‘আমার বাবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আমি শুধু এটুকুই বলব যে, তিনি যদি নিজের কষ্ট নিয়ে আরও একটু অভিযোগ করতেন তবে ভালো হতো, কারণ অবস্থা ভালো নয়। তাঁর ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে। এটি হাড় এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।’
২০২৫ সালের মে মাসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তাঁর ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার সময় চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্ত করেছেন। যা সে সময় তাঁর হাড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রায় ১০ মাস পর ক্যানসারের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত করে ফেলেছিলেন। প্রাইমারিগুলোতে তিনি বড় জয় পেয়েছিলেন। তবে তাঁর বার্ধক্য নিয়ে উদ্বেগের জন্ম হচ্ছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ২০২৪ সালের ২৭ জুন। ওই দিন নির্বাচনী মৌসুমের প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি হন বাইডেন।
ট্রাম্প ও বাইডেনের বয়সের ব্যবধান খুব বেশি না হলেও সেদিন মঞ্চে বাইডেনকে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই আড়ষ্ট দেখাচ্ছিল। তিনি ছোট ছোট কদমে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন এমনভাবে নিজের পোডিয়ামের দিকে যাচ্ছিলেন। এরপর বক্তব্যের মাঝখানে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন।
একপর্যায়ে জাতীয় ঋণ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ৮১ বছর বয়সী বাইডেনের কথা জড়িয়ে যায়। তিনি হঠাৎ বলে বসেন, ‘আমরা অবশেষে মেডিকেয়ারকে হারিয়েছি।’
পরে ঘটনাটি প্রসঙ্গে তাঁর স্ত্রী জিল বাইডেন বলেন, তাঁর স্বামী স্ট্রোক করেছেন বলে আশঙ্কা করেছিলেন তিনি। বাইডেনকে আগে বা পরে কখনো এমন আচরণ করতে দেখেননি বলে জানান জিল। কিন্তু ট্রাম্প বাইডেনের স্বাস্থ্য নিয়ে এই স্থায়ী প্রশ্নগুলোকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে তাঁর নীতিগত সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করতে শুরু করেন।
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত জয় পান ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য হোয়াইট হাউসে ফেরেন তিনি। এর আগে ২০২০ সালের নির্বাচনে বাইডেনের কাছে হেরেছিলেন ট্রাম্প।
এদিকে ডেমোক্রেটদের মনে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে যে, বাইডেন যদি আরও নির্বাচনী লড়াই থেকে আরও আগে সরে দাঁড়াতেন কিংবা প্রার্থীই না হতেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন হতে পারত কি না। বিষয়টিতে দলের অভ্যন্তরে বিভাজনেরও জন্ম হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে ও’কনেল হান্টার বাইডেনকে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি তাঁর বাবার বহুল আলোচিত ওই বিতর্ক দেখেছিলেন কি না। হান্টার জানান, ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজ বাড়িতে বসে একাই তিনি বিতর্কটি দেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘অন্য সবার মতো আমিও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার বাবা মঞ্চে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম কোনো একটা সমস্যা হয়েছে। তাঁর চোখেমুখে এমন এক শূন্য দৃষ্টি আমি আগে কখনো দেখিনি।’
সৎমা জিল বাইডেনের মতো হান্টারও ঘটনাটিকে ব্যতিক্রম হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি অনেক বেশি বিস্ময়ের ছিল কারণ এমনটা আগে কখনো ঘটেনি এবং এরপরও ঘটেনি।’
পরের বছর শনাক্ত হওয়া জো বাইডেনের ক্যানসারই হয়তো বিতর্কে তাঁর পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছিল। হান্টার বলেন, ‘নয় মাস পর তাঁর স্টেজ-৪ প্রোস্টেট ক্যানসার এবং স্টেজ-৪ মেটাস্ট্যাটিক বোন ক্যানসার ধরা পড়ে, যার কোনোটির কথাই আমরা জানতাম না।’
জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির সময় ছেলে হান্টার বাইডেন নিজেও বহু বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন। হান্টার নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থে বাবার রাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়েছেন বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন রিপাবলিকানরা।
হান্টার মাদকাসক্তির সঙ্গেও লড়াই করেছেন। ২০২৪ সালের জুনে মাদকাসক্ত অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনের অভিযোগে তাঁকে তিনটি গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্রের আবেদনপত্রে নিজের মাদকাসক্তির বিষয়টি গোপন করেও তিনি মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। এ ধরনের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা সাধারণত বিরল।
একই বছর হান্টার ফেডারেল কর ফাঁকির অভিযোগেও দোষ স্বীকার করেন। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ১৪ লাখ ডলার কর পরিশোধ না করার অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে।
যদিও জো বাইডেন নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি তাঁর ছেলের অপরাধের জন্য বিশেষ ক্ষমা প্রদর্শন (পার্ডন) করবেন না, কিন্তু প্রেসিডেন্সির শেষ সপ্তাহে এসে তিনি হঠাৎ নিজের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
নিজের মেয়াদ শেষ হওয়ার দুই মাসেরও কম সময় বাকি থাকতে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর জো বাইডেন লেখেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিন থেকেই আমি বলেছিলাম যে বিচার বিভাগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমি হস্তক্ষেপ করব না। এমনকি আমার ছেলেকে বেছে বেছে ও অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করার সময়ও আমি আমার কথা রেখেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘হান্টারকে ভেঙে ফেলার মাধ্যমে তারা আমাকে ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছে, এবং এই পরিস্থিতি এখানেই থেমে যাবে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। এবার অনেক হয়েছে।’
ছেলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে জো বাইডেন ২০১৪ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত হান্টারের নেওয়া যেকোনো পদক্ষেপের জন্য তাঁকে ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত ক্ষমা’ দেন। সে সময় নিজের ভাই জেমস বাইডেনকেও ‘ক্ষমা’ করে দেন জো বাইডেন।
সাক্ষাৎকারে ও’কনেল হান্টার বাইডেনের সামনে এই প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। উত্তরে হান্টার স্বীকার করেন, এই ক্ষমা প্রথা বিতর্কিত ছিল। তিনি বলেন, ‘এটি কি আমাদের সংবিধানের জন্য ভালো ছিল? মার্কিন জনগণের জন্য ভালো ছিল? আমার বাবার ভাবমূর্তির জন্য ভালো ছিল? কোনো ক্ষেত্রেই নয়। বিষয়টি সহজেই সমালোচনা করা যায় এবং তার যথেষ্ট কারণও আছে। আমি তা অস্বীকার করার ভান করতে পারি না।’
তবে হান্টার আরও বলেন যে, ট্রাম্পের বিষয়ে তাঁর বাবার আশঙ্কাগুলো সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় রাজনৈতিক শত্রুদের ওপর প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসা নেওয়ার ক্ষেত্রে আমার বাবা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ঠিক যেমনটা ভেবেছিলেন, ট্রাম্প নিজেকে অবিকল তেমনই প্রমাণ করেছেন।’