ইরানের সঙ্গে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত ৩৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। প্রতি মাসে এই ব্যয় আরও ৩ বিলিয়ন ডলার করে বাড়তে পারে। স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন কংগ্রেসের নির্দলীয় বাজেট বিশ্লেষক সংস্থা কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস (সিবিও) এ তথ্য জানিয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
সিবিওর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের প্রথম তিন মাসে এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে। সংস্থাটির এই হিসাব ১ আগস্ট পর্যন্ত যুদ্ধের ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে করা হয়েছে। যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে চাপ তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে অন্য কোনো সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়ছে এমনিতেই চাপের মুখে থাকা দেশটির ফেডারেল বাজেটের ওপরও।
এই ব্যয় ২১ জুলাই সিনেটের এক শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দেওয়া ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের কাছাকাছি। সিবিও জানিয়েছে, যুদ্ধের ব্যয়ের বড় অংশই এসেছে দ্রুতগতিতে অস্ত্রভান্ডারের গোলাবারুদ ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করার কারণে। সংস্থাটি অনুমান করছে, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
আগস্টে রয়টার্স জানিয়েছিল, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার দূরপাল্লার নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রের ‘প্রায় সবই’ ব্যবহার করেছে।
সিবিও জানিয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর কংগ্রেসের আর্থিক নিরীক্ষকদের সঙ্গে সহযোগিতা করেনি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের বাজেট কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য পেনসিলভানিয়ার ব্রেন্ডন বয়েলের অনুরোধে এই ব্যয়ের তদন্ত করা হয়।
এক বিবৃতিতে বয়েল বলেন, ‘ইরানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপর্যয়কর যুদ্ধে ইতোমধ্যে সাহসী মার্কিন সেনাসদস্যরা প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘এই মানবিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরে নির্দলীয় সিবিওর এই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই যুদ্ধ মার্কিন করদাতাদের ইতোমধ্যে কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার খরচ করিয়েছে এবং ব্যয় আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে এটি জীবনযাত্রার খরচও বাড়িয়ে চলেছে।’
সিবিওর প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সাম্প্রতিক হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ ছাড়া যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে সরকারকে যে ঋণ নিতে হয়েছে, তার সুদ ও অন্যান্য ঋণসংক্রান্ত ব্যয়ও এই হিসাবে ধরা হয়নি। এসব ব্যয় মোট খরচের সঙ্গে আরও কয়েক দশমিক বিলিয়ন ডলার যোগ করতে পারে।
ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন।
সিবিওর হিসাব বলছে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার অস্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধাস্ত্রের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় অন্য কোনো বড় সংঘাতের ক্ষেত্রে পেন্টাগনের প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে চীন ও তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতও রয়েছে।
জুলাইয়ে সিনেটের শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলার জরুরি তহবিল চেয়েছিলেন। সেই সময় হেগসেথ বলেছিলেন, ‘এই অর্থ না পেলে আমরা গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতির মুখে পড়ব।’
এদিকে পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেল চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এসব হামলায় যুদ্ধবিমান, জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান এবং ড্রোনসহ বিভিন্ন ধরনের বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইন্সপেক্টর জেনারেলের হিসাব অনুযায়ী, ১৯ জুন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছিল ৩৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ইরানের হামলায় মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনার প্রায় ১৮৪ মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
হরমুজ প্রণালিতে হামলা এবং পার্শ্ববর্তী উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ভোক্তা ও বিশ্বের জ্বালানি উৎপাদকদের জন্য দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের বাড়তে থাকা ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অবনতিশীল আর্থিক অবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে। আগস্টে দেশটির মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়মিতভাবে ইরান যুদ্ধের সঙ্গে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১-এর হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক ও আফগানিস্তানে চালানো সামরিক অভিযানের তুলনা করেন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আট বছরব্যাপী যুদ্ধে সর্বোচ্চ পর্যায়ে এক লাখের বেশি স্থলসেনা মোতায়েন ছিল এবং ওই যুদ্ধে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়।
অন্যদিকে, আফগানিস্তানে দুই দশক ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে সবচেয়ে তীব্র সময়ে এক লাখের বেশি সেনা মোতায়েন ছিল। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কস্টস অব ওয়ার’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ওই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।