ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধ শেষ করতে ফের বড় ধরনের হামলা শুরু করবেন কি না, সে বিষয়ে তাঁকে শিগগিরই বড় সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই অবস্থান ব্যক্ত করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমার সামনে একটি বড় সিদ্ধান্ত আসছে। আমি কি তাদের (ইরানি শাসনব্যবস্থা) ঢুকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেব, নাকি দেব না? এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত। আমার সঙ্গে যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে।’
এর আগে ট্রাম্প একই ধরনের হুমকি দিলেও এবার তার মন্তব্যটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন আগামী মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ছয়টি উপসাগরীয় দেশের নেতাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। দেশগুলো হলো—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান।
এই বৈঠক ইরান যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের জন্য আবারও চেষ্টা করা হবে, নাকি সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা হবে। ট্রাম্প যদি বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করতে চান, তাহলে তার জন্য আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন প্রয়োজন হবে।
গত কয়েক দিনে ট্রাম্প বেশ কয়েকবার বলেছেন, ইরান যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হবে। তবে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাতটি এখন এমন এক অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাদের মতে, এটি এখন এমন এক অচলাবস্থায় রয়েছে যেখানে পুরোপুরি যুদ্ধও হচ্ছে না, আবার শান্তিও নেই। ওই কর্মকর্তারা মনে করেন, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত কোনো চুক্তি না হলে নির্বাচনের পর ট্রাম্প আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন।
অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে আঞ্চলিক মিত্রদের কাছ থেকে সরাসরি মতামত নিতে জাতিসংঘের বৈঠকটি ব্যবহার করতে চান তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানতে চাই তারা কোথায় আছে এবং তারা কেমন করছে। আমরা তাদের খুব সুরক্ষা দিয়ে আসছি।’
তবে যুদ্ধের পরবর্তী পথ সম্পর্কে তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সিদ্ধান্ত নেবেন, নাকি পরে নেবেন, সে বিষয়ে কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানান। এর আগে আগস্টের শুরুতে সৌদি আরব ও কাতার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করলে প্রতিশোধ হিসেবে ইরান সৌদি আরবের তেল ও গ্যাস স্থাপনায় হামলা করতে পারে। ওই উদ্বেগের পর ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ান।
এরপর থেকে ট্রাম্প তুলনামূলকভাবে ‘লো-কি’ বা কম উত্তেজনাপূর্ণ পদ্ধতি অনুসরণ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রাখা, নতুন করে বড় ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অভিযান শুরু করা, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা ও বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ানোর দিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে মনোযোগী করা।
মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। তবে জ্বালানি পরিবহন এখনও যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার নিচে রয়েছে এবং তেলের দামও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক বাহিনীর বর্তমান মাত্রার উপস্থিতি বছরের শেষ পর্যন্ত বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, প্রয়োজনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান আবার শুরু করার জন্য প্রস্তুত থাকা।
ওই কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাম্পকে দ্রুতই পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর একটি কারণ হলো, মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমান এই ‘অপেক্ষমাণ’ অবস্থায় আর খুব বেশি দিন থাকতে পারবে না। এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘একপর্যায়ে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতেই হবে, শেষ লক্ষ্যটা কী।’
অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, নৌ অবরোধের মাধ্যমে ইরানকে তেল রপ্তানি করতে না দেওয়ায় তিনি খুবই সন্তুষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা শুরু করার পর থেকে একটি জাহাজও ইরানে যায়নি। তারা চেষ্টা করেছিল এবং আমরা তাদের উড়িয়ে দিয়েছি।’ ট্রাম্প আরও বলেন, ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং ইরানিরা এখনও একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায়।
এদিকে হোয়াইট হাউস যুদ্ধ পরবর্তী একটি কৌশল নিয়েও কাজ করছে। ওই পরিকল্পনায় ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আঞ্চলিক উদ্যোগ নেওয়া এবং ইসরায়েল ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনাটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর খসড়া তৈরি করা হচ্ছে। তবে ইরান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এবং ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি কী হবে, সেই কৌশল নির্ধারণে এটি ব্যবহার করার লক্ষ্য রয়েছে।
এই পরিকল্পনার ওপর দুটি বড় ঘটনা প্রভাব ফেলছে। একটি হলো ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্বাচন এবং অন্যটি হলো নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। আগামী সপ্তাহে নিউইয়র্কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন কি না, জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘হতে পারে।’