ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলতি সপ্তাহে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মোটেও চূড়ান্ত কিছু নয় বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা স্মারকের শর্ত যদি তাঁর পছন্দ না হয় কিংবা ইরান যদি ‘সঠিক আচরণ’ না করে, তবে তিনি আবারও দেশটিতে হামলা শুরু করবেন।
আজ বুধবার (১৭ জুন) ফ্রান্সে আয়োজিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়ে ট্রাম্প এই মন্তব্য করেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফ্রান্সের লেক জেনেভা তীরের শহর এভিয়ান-লে-বাঁ-এ জি-৭ নেতাদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি নিয়ে তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘এটি কেবলই একটি সমঝোতা স্মারক। যদি আমার এটি পছন্দ না হয়, তবে আমরা আবারও তাদের ওপর গুলি চালানো ও মাথার ওপর বোমা ফেলা শুরু করব। তারা যদি ভদ্র আচরণ না করে, আমরা সরাসরি তাদের মাথার ঠিক মাঝখানে বোমা ফেলব, ঠিক আছে?’
এদিকে আগামী শুক্রবার এই সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরের জন্য সুইজারল্যান্ডে একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। তার ঠিক দুদিন আগে ট্রাম্পের এমন মন্তব্য পুরো প্রক্রিয়াটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে গত এপ্রিল মাসে ঘোষিত সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে, যাতে দুই দেশ একটি স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ফলে এ পর্যন্ত মূলত ইরান ও লেবাননে সাত হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, যুদ্ধ শুরু করার সময় ট্রাম্প যেসব লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন, তার খুব কমই অর্জিত হয়েছে। ইরানের বর্তমান সরকার এখনো বহাল রয়েছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ধ্বংস করা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে এমন নরম শর্তে যুদ্ধ বন্ধ করা আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে তাঁর নিজের রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের কট্টরপন্থীদের তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে।
জি-৭ জোটের নেতারা (যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপান) এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার নীতিকে তাঁরা কখনই পুরোপুরি সমর্থন করেননি। নেতারা আশঙ্কা করছেন, এই পরাশক্তি মার্কিন আক্রমণ ঠেকিয়ে ও হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে তেহরান হয়তো কূটনৈতিক টেবিলে বাড়তি সুবিধা পেয়ে গেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় জি-৭ নেতারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমাতে তাঁরা এখন বিকল্প ও বৈচিত্র্যময় জ্বালানি সরবরাহ রুট তৈরির ওপর জোর দেবেন। অবশ্য শুক্রবার প্রণালিটি খুলে দেওয়া হলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক জোট সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করবে।
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে লেবাননের ভাগ্য নিয়ে। গত মার্চ মাসে ইসরায়েল লেবানন আক্রমণ করে এবং বর্তমানে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে, যার ফলে ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইরান দাবি করছে, স্থায়ী চুক্তির জন্য লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা থেকে বাদ পড়া ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা সেনা সরাবে না এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার জারি রাখবে। এই ইস্যুতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্পের প্রকাশ্য দূরত্ব ও বাগ্যুদ্ধ তৈরি হয়েছে। তবে জি-৭ নেতারা লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে আগামী শুক্রবার হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের মূল্য প্রতি ব্যারেলে ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে, যা গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর সর্বনিম্ন।