হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

ভাঙা টয়লেট, খাবারের সংকট—যুদ্ধজাহাজ থেকে ঝাঁপ দিতে চাইছেন মার্কিন নাবিকেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থেকে উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে একটি ইএ-১৮জি গ্রোলারকে। ছবি: ইউএস নেভি

মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েনের প্রায় ২১০ দিন পার করেছে মার্কিন নৌবাহিনীর বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এক জায়গায় দীর্ঘদিনের এই মোতায়েন, কঠিন জীবনযাপন ও খাবারের সংকটে জাহাজটির কিছু নাবিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি হতাশা ও নিম্ন মনোবলের কারণে কয়েকজন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানবিরোধী যুদ্ধের মধ্যে আব্রাহাম লিংকনের নাবিকেরা দীর্ঘ সময় ধরে সাগরে অবস্থান করছেন। জুনে স্বাক্ষরিত একটি ভঙ্গুর শান্তিচুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।

এর মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধও জোরদার করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রায় ২০টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে, যার মধ্যে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনও রয়েছে।

‘ভেঙে পড়ার পর্যায়ে’ নাবিকেরা

দীর্ঘ এই মোতায়েনের শেষ কবে হবে, তার কোনো স্পষ্ট ধারণা না থাকায় নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

মিলিটারি টাইমসকে অ্যানাবেল লোমা নামের এক নারী জানান, তাঁর স্বামীও বিমানবাহী রণতরি থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করা নাবিকদের একজন। তিনি বলেন, ‘সে ভয় পাচ্ছে। সে মনে করছে, তাকে অসম্মানজনকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।’

লোমা জানান, জাহাজের ওমবাডসম্যানের কাছ থেকে তিনি ঘটনাটি জানতে পেরেছেন। তবে এ বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর কাছ থেকে তিনি কোনো তথ্য পাননি। তাঁর স্বামীকে বর্তমানে মেডিকেল হোল্ডে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, চিকিৎসাজনিত কারণে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

আরেক সংবাদমাধ্যম দ্য ক্রেডল জানিয়েছে, আব্রাহাম লিংকনের অন্তত ছয়জন নাবিক জাহাজ থেকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

এমনই একটি ঘটনায় এক নাবিকের স্ত্রী জানান, তাঁর স্বামী শেষ মুহূর্তে এক সহকর্মীকে রক্ষা করেন। মিলিটারি টাইমসকে মারিয়া রদ্রিগেজ বলেন, তাঁর স্বামী সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করা ওই নাবিককে দুই হাত ধরে টেনে ডেকে তুলে আনেন।

আরেক নাবিক মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিখ্যাত সংবাদপত্র স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসকে জানান, জাহাজে দায়িত্ব পালনরত ‘ওয়াচ স্ট্যান্ডাররা’ এক সহকর্মীকে সাগরে ঝাঁপ দেওয়া থেকে থামিয়েছেন।

খাবারের সংকট, নষ্ট টয়লেট

আব্রাহাম লিংকনে থাকা নাবিকেরা জাহাজের জীবনযাত্রার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মোতায়েনের মেয়াদ মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়েছে।

বিমানবাহী রণতরিটি ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে সাগরে রয়েছে। তখন এটি সান দিয়েগো থেকে মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে জানুয়ারিতে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে জাহাজটি টানা প্রায় ২৫০ দিন সাগরে কাটিয়েছে।

সাধারণত দীর্ঘ সময়ের জন্য মোতায়েন করা যুদ্ধজাহাজগুলোকে নিয়মিত রসদ সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিভিন্ন বন্দরে নেওয়া হয়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে এমন সুযোগ না থাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় নাবিক ও মেরিনরা জাহাজের পরিস্থিতিকে হতাশাজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, কোনো কোনো সময় তাঁদের মাত্র আধা কাপ ভাত ও দুটি টরটিলা দেওয়া হচ্ছে। সাবান ও টুথপেস্টের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মজুতও শেষ হয়ে গেছে।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, জাহাজের বেশ কিছু টয়লেট নষ্ট, গোসলখানায় ছত্রাক জমেছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে লন্ড্রি সেবা পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনী কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। শুধু জানিয়েছে, প্রত্যেক নাবিকের ‘মানসিক প্রস্তুতি’ বা মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পরিবারগুলোর সঙ্গে বৈঠক

এদিকে গত সপ্তাহে সান দিয়েগোতে প্রায় ২০০ নাবিকের পরিবারের সদস্য একটি বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাওয়ের কাছে জাহাজটির পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়।

কবে আব্রাহাম লিংকনকে বন্দর থেকে বিশ্রাম ও রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেননি তিনি। তবে তিনি জানান, ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টকে আব্রাহাম লিংকনের জায়গায় পাঠানো হবে।

আব্রাহাম লিংকনে থাকা এক নাবিকের সৎমা বনি ইয়র্ক দি ইনডিপেনডেন্টকে বলেন, জাহাজে অবস্থানরত নাবিকদের মনোবল ভালো নয়। জাহাজের চিকিৎসকেরা বলেছেন, দ্রুত বন্দরে না গেলে নাবিকদের কেউ কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন।

আগেও উঠেছিল একই অভিযোগ

তবে মার্কিন নৌবাহিনীতে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। চলতি বছরের শুরুতে ইউএসএস ট্রিপলি ও ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ডেও পয়োনিষ্কাশন সমস্যা ও খাবারের সংকটের অভিযোগ উঠেছিল। তখন মার্কিন নৌবাহিনী এসব প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল।

এ ছাড়া মে মাসে জেরাল্ড আর ফোর্ডে আগুন লাগার ঘটনাটি নিয়েও জল্পনা তৈরি হয়েছিল। ক্লান্ত ও অতিরিক্ত চাপে থাকা নাবিকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগিয়ে থাকতে পারেন—এমন সন্দেহের কথাও তখন আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে মার্কিন নৌবাহিনী তদন্ত শুরু করেছে।

আব্রাহাম লিংকনের বর্তমান পরিস্থিতি ও আগের ঘটনাগুলো মিলিয়ে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতের মধ্যে মার্কিন নৌসদস্যদের ওপর তৈরি হওয়া চাপের বিষয়টি আবার সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অবস্থান, অনিশ্চিত মোতায়েনের মেয়াদ, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট এবং জীবনযাত্রার নানা সমস্যার কারণে নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে বলে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।