এক দশক আগে ২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যখন কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করেছিলেন, তখন দেশটিতে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করা রাজধানী হাভানার বাসিন্দা ম্যান্ডি প্রুনা সেই ঘটনার কথা স্মরণ করেন। তিনি জানান, সে সময় মার্কিন পর্যটকদের ঢল নেমেছিল কিউবায়। তাঁর উজ্জ্বল লাল ১৯৫৭ সালের শেভরোলেট ক্ল্যাসিক গাড়িটি ছিল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। অভিনেতা-সংগীতশিল্পীসহ বহু তারকা তাঁর গাড়িতে চড়ে হাভানা শহর ভ্রমণ করেছেন।
কিন্তু সেই উজ্জ্বল সময় এখন অতীত। মার্কিন প্রশাসনের নতুন চাপ, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ফলে কিউবা ভয়াবহ জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর পদক্ষেপ এবং মেক্সিকোর বিরুদ্ধে শুল্ক হুমকির মাধ্যমে কিউবায় তেলের প্রবাহ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে কিউবার অর্থনীতি সচল রাখার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি আর অবশিষ্ট নেই।
বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে সিএনএন জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কিউবার পর্যটন খাতেও ধস নেমেছে। রাশিয়া ও কানাডা থেকে ফ্লাইট বাতিল হয়েছে জেট ফুয়েলের ঘাটতির কারণে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা তাদের নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয় কিউবা ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটির বার্ষিক হাবানোস সিগার উৎসব বাতিল করা হয়েছে, যা প্রতিবছর বিপুল ডলার আয় এনে দিত। খনি প্রতিষ্ঠান শেরিট ইন্টারন্যাশনালও জ্বালানি সংকটে কার্যক্রম স্থগিত করেছে।
এ অবস্থায় দেশটির প্রায় এক কোটি মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই অচল হয়ে পড়ছে। বহু স্কুলে ক্লাস বন্ধ, কর্মীদের ছাঁটাই বা সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য। সরকারি হাসপাতালগুলো সেবা কমিয়েছে। জ্বালানি না থাকায় আবর্জনা অপসারণে বিভিন্ন এলাকায় ময়লার স্তূপ জমছে। রাতে হাভানার অধিকাংশ এলাকা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অন্ধকারে ডুবে যায়।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন—যদি আলোচনা হয়, তবে তা কিউবার কমিউনিস্ট নেতৃত্বকে ক্ষমতা ছাড়ার বিষয়েই হতে পারে। তিনি দাবি করেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভেনেজুয়েলার ভর্তুকির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা কিউবার অর্থনৈতিক মডেল এখন উন্মোচিত হয়ে গেছে।
অন্যদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল জনগণকে ‘সৃজনশীল প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যেখানে যা উৎপাদন সম্ভব, সেখানেই তা খেতে হবে; জ্বালানি কম থাকলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহও ব্যাহত হবে।
কিউবার অধিকাংশ খাদ্য আমদানিনির্ভর। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খাদ্য আমদানি বন্ধ করেছে। কারণ তারা পণ্য সংরক্ষণে হিমাগার ব্যবস্থা সচল রাখতে পারছে না। এর ফলে বাজারে ফল-সবজির দাম দুই থেকে তিনগুণ বেড়েছে।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, দীর্ঘদিন পর্যটকদের সঙ্গে দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা ম্যান্ডি প্রুনা এখন পরিবার নিয়ে স্পেনে পাড়ি জমানোর কথা ভাবছেন। তিনি বলেন, ‘গ্যাস কিনতে ডলার লাগবে, কিন্তু পর্যটকই নেই—খরচ তুলব কীভাবে?’ ইতিমধ্যে তিনি তাঁর ক্ল্যাসিক গাড়িচালকের লাইসেন্স স্থগিত করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই সংকট অব্যাহত থাকলে কিউবা এক গভীর মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগোতে পারে।