সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় অসদাচরণের অভিযোগে ছোট ভাই অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের গ্রেপ্তারের পর মুখ খুলেছেন ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় চার্লস। আজ এক বিবৃতিতে রাজা জানিয়েছেন, এই ঘটনার ‘পূর্ণাঙ্গ, সুষ্ঠু ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ সম্পন্ন হতে হবে। ভাইয়ের গ্রেপ্তারের খবরটি তিনি ‘গভীর উদ্বেগের’ সঙ্গে শুনেছেন উল্লেখ করে রাজা স্পষ্ট করে দেন, এ ক্ষেত্রে আইন সবার জন্য সমান।
রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ‘অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের বিরুদ্ধে সরকারি পদে অসদাচরণের যে অভিযোগ উঠেছে, সেই খবরটি আমি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে শুনেছি। এখন ইস্যুটি নিয়ে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ পদ্ধতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুষ্ঠু ও সঠিক তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে।’
রাজা আরও বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি এবং আবারও বলছি, এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের পূর্ণ ও সর্বাত্মক সমর্থন এবং সহযোগিতা পাবে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’
তদন্তের স্পর্শকাতরতা বজায় রাখতে রাজা চার্লস জানিয়েছেন, প্রক্রিয়াটি চলাকালীন তিনি এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করবেন না। তিনি বলেন, ‘যেহেতু এই আইনি প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চলমান, তাই এ বিষয়ে আমার পক্ষ থেকে আর কোনো মন্তব্য করা সমীচীন হবে না। এর পরিবর্তে, আমার পরিবার এবং আমি আপনাদের সেবায় আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে যাব।’
আজ বৃহস্পতিবার ছিল সাবেক ডিউক অব ইয়র্ক অ্যান্ড্রুর ৬৬তম জন্মদিন। আধুনিক ব্রিটিশ রাজপরিবারের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জ্যেষ্ঠ সদস্যকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার নজির সৃষ্টি হলো। কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং বাণিজ্য দূত থাকাকালীন তাঁকে স্পর্শকাতর তথ্য দেওয়ার অভিযোগে টেমস ভ্যালি পুলিশ আজ স্থানীয় সময় সকালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে। জানা গেছে, প্রিন্স উইলিয়াম এবং প্রিন্সেস অফ ওয়েলসও রাজার এই কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করেছেন।
বাকিংহাম প্যালেসের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, অ্যান্ড্রুর কর্মকাণ্ড নিয়ে যেসব নতুন তথ্য উঠে আসছে, সে বিষয়ে রাজা তাঁর ‘গভীর উদ্বেগ’ পুনর্ব্যক্ত করেছেন। মুখপাত্র বলেন, ‘অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে ওঠা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর মোকাবিলা তাঁকেই করতে হবে। তবে টেমস ভ্যালি পুলিশ আমাদের কাছে কোনো সহায়তা চাইলে আমরা রাজকীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’
ধারণা করা হচ্ছে, অ্যান্ড্রু যখন সরকারের বাণিজ্য দূত হিসেবে কাজ করছিলেন, সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও তাঁর বিদেশ সফরের বিবরণ প্যালেসের কাছে সংরক্ষিত আছে। পুলিশ চাইলে এসব তথ্য সরবরাহ করা হতে পারে। তবে ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, সার্বভৌম রাজা হিসেবে চার্লসকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না, কারণ বিচারকার্য রাজার নামেই সম্পাদিত হয়। তবে তিনি চাইলে স্বেচ্ছায় পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারেন।
এর আগে গত বছর প্রিন্স হ্যারি তাঁর স্মৃতিকথা ‘স্পেয়ার’-এ প্রথম রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে অ্যান্ড্রুর সমালোচনা করেছিলেন। হ্যারি লিখেছিলেন, এক তরুণীকে যৌন নিপীড়নের মতো কলঙ্কিত কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ার পরও অ্যান্ড্রুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেন বহাল রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। চলতি মাসের শুরুতে প্রিন্স এডওয়ার্ডও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরকালে ভুক্তভোগীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, এই পুরো ঘটনায় যারা ভুক্তভোগী, তাদের কথা মনে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অ্যান্ড্রু ইস্যু নিয়ে রাজাকে সম্প্রতি জনসাধারণের তোপের মুখেও পড়তে হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ক্লিথেরো স্টেশনে একটি অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি চিৎকার করে রাজাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন, ‘চার্লস, আপনি কত দিন ধরে অ্যান্ড্রু এবং এপস্টেইনের কথা জানেন? আপনি কি অ্যান্ড্রুকে বিচার থেকে বাঁচাতে সুরক্ষা দিচ্ছেন?’ রাজা তখন শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামাল দিলেও বিষয়টি নিয়ে রাজপরিবারের ভেতরে অস্বস্তি চরম পর্যায়ে ছিল।
গত বছরের অক্টোবরেই বাকিংহাম প্যালেস ঘোষণা করে, অ্যান্ড্রু তাঁর ‘প্রিন্স’ উপাধি হারাবেন এবং তাঁকে ‘রয়্যাল লজ’ ত্যাগ করতে হবে। এরপর থেকে তিনি কেবল ‘অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর’ হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেন। আজ তাঁর গ্রেপ্তারের ঘটনায় রাজা ও রানি আবারও জানিয়েছেন, তাঁদের সমস্ত সহানুভূতি যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ও সারভাইভারদের সঙ্গে রয়েছে।