দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত ও কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই ফুটবল বিশ্বকাপে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা পেয়েছেন ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়েরা। লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের প্রথম ম্যাচের মাত্র ১০ দিন আগে এই ভিসা অনুমোদনের খবর সামনে এল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে—হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের খেলোয়াড়দের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা রাতারাতি অনুমোদন করা হয়েছে। এর আগে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আবুলফজল পাসানদিদেহ বলেছিলেন, জাতীয় দলের সদস্যরা তখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি।
গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টম বারাকও ভিসার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ইরানের জাতীয় ফুটবল দলের ভিসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আঙ্কারায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
তবে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি। ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স শুক্রবার জানিয়েছে, জাতীয় দলের কারিগরি ও প্রশাসনিক স্টাফদের কয়েকজন সদস্য এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাননি। প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় দলের কারিগরি ও নির্বাহী স্টাফদের কিছু সদস্যের ভিসা এখনো ইস্যু করা হয়নি এবং এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস তাদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যদিও প্রতিবেদনে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সূত্রের উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে, ইরান ফুটবল ফেডারেশন এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে এবারের বিশ্বকাপ শুধু ক্রীড়া আয়োজনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি ক্রমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরটিকে দুই পক্ষই রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও এটি একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। ১৯৩০ সালে টুর্নামেন্ট শুরুর পর এই প্রথম কোনো আয়োজক দেশ এমন একটি রাষ্ট্রকে স্বাগত জানাতে যাচ্ছে, যার সঙ্গে তার যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান। ভিসা জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে দলের উপস্থিতি সীমিত রাখার বিষয়ে ইরানের অভ্যন্তরে বাড়তে থাকা মনোভাবের কারণে তেহরান শেষ মুহূর্তে দলের বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিজুয়ানায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইরান দলের আগামীকাল রোববার ভোরে তিজুয়ানায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
গ্রুপ ‘জি’তে থাকা ইরান ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলবে। একই শহরে তারা বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে। এরপর গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে সিয়াটলে মিসরের বিপক্ষে মাঠে নামবে।
রাষ্ট্রদূত আবুলফজল পাসানদিদেহ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান দলকে নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থান করতে না দেওয়ার কথা জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গলবার মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বলেন, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে সম্পৃক্ত কোনো ব্যক্তিকে ইরানের বিশ্বকাপ প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। আইআরজিসি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর একটি শক্তিশালী শাখা।
এই প্রসঙ্গে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মাহদি তাজের নামও আলোচনায় এসেছে। তিনি আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার। গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গেলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রদূত পাসানদিদেহের মতে, প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সত্ত্বেও বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান এখনো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতের একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে আগ্রহী।
মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসে স্প্যানিশ ভাষার একজন দোভাষীর মাধ্যমে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ, এমনকি যাকে তার শত্রুর ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয় সেই যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও, প্রমাণ করে যে ইরান শান্তি চায়।’
তবে শান্তির পথে অগ্রগতি এখনো ধীর। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা খুব দ্রুত এগোচ্ছে না। তবুও দুই পক্ষ সামরিক হামলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতার দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।