যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের দেওয়া একটি প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। ওই প্রস্তাবে সম্প্রতি মেয়াদ শেষ হওয়া কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনের সীমা স্বেচ্ছায় আরও কিছু সময়ের জন্য বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার ট্রাম্প বলেন, তিনি চান দুই দেশের আলোচকেরা বসে নতুন একটি চুক্তি করুক। তাঁর ভাষায়, পুরোনো চুক্তিটি ছিল ‘খুব বাজেভাবে করা।’
নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বদলে আমাদের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নতুন, উন্নত ও আধুনিক একটি চুক্তি তৈরি করা উচিত। এই চুক্তি যেন অনেক বছর ধরে টিকে থাকে।’ তিনি আরও দাবি করেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য খারাপভাবে আলোচিত হয়েছিল এবং নানা দিক থেকে তা গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে।
ট্রাম্প আগেও বলেছেন, তিনি চান চীনও নতুন এই চুক্তিতে যুক্ত হোক। তবে বেইজিং এখন পর্যন্ত এতে আগ্রহ দেখায়নি। নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কমে গেল। এতে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন একটি সময়ে এই উদ্বেগ বেড়েছে, যখন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিশ্বজুড়ে আবারও দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
গত বছর পুতিন বলেছিলেন, ওয়াশিংটন একই প্রতিশ্রুতি দিলে রাশিয়া আরও এক বছর এই চুক্তি মেনে চলবে। যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই অভিযোগ করে আসছিল, এই চুক্তি রাশিয়া ও চীনের বিরুদ্ধে আরও ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতাকে সীমিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার ওই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বৃহস্পতিবার মস্কো দুঃখ প্রকাশ করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাশিয়া ‘দায়িত্বশীল ও সতর্ক’ অবস্থানই নেবে। তিনি বলেন, অবশ্যই রাশিয়া সবার আগে নিজের জাতীয় স্বার্থকেই গুরুত্ব দেবে।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক শিহাব রাত্তানসি জানান, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য আবুধাবিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা নিউ স্টার্ট চুক্তি ছয় মাসের জন্য বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করেছেন বলে জানা গেছে। রাত্তানসি বলেন, এটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক ‘হ্যান্ডশেক ডিল’ হতে পারে। কারণ, চুক্তির নিয়ম অনুযায়ী আর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, এই অস্থায়ী বাড়ানোর ব্যবস্থা হলে এরপর দুই দেশ নতুন একটি পারমাণবিক চুক্তি তৈরির জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করতে চায়।
এরই মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মতো পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ বিশ্লেষকদের উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, যুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার ঠেকাতে যেসব নিষেধাজ্ঞা ও চুক্তি ছিল, সেগুলোর প্রভাব ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর আগে পুতিন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইউক্রেনকে সহায়তা দিতে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্যোগের জবাবে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়।
প্রথম স্টার্ট চুক্তি ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। ২০১০ সালে ‘নিউ স্টার্ট’ নামে নতুন একটি চুক্তি সই হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ সই করেন। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৫০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড এবং ৭০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমারু বিমান মোতায়েন ও প্রস্তুত অবস্থায় রাখার সীমা নির্ধারণ করা হয়।
এরপর ২০২১ সালে এই চুক্তির মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়। সে সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়।