ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত যুদ্ধের আইনি ও নৈতিক ভিত্তি নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরেই নজিরবিহীন বিতর্ক শুরু হয়েছে। গতকাল বুধবার মার্কিন ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ডের একটি সাক্ষ্য এবং কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের প্রধান জো কেন্টের পদত্যাগ ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটিতে দেওয়া লিখিত সাক্ষ্যে তুলসী গ্যাবার্ড স্বীকার করেছেন, ২০২৫ সালের জুনে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর পর ইরান তাদের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা পুনর্গঠনের কোনো চেষ্টাই করেনি। গ্যাবার্ডের এই মূল্যায়ন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই দাবিকে সরাসরি খণ্ডন করে, যেখানে তিনি ইরানকে একটি ‘আসন্ন পরমাণু হুমকি’ হিসেবে চিত্রিত করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন।
মজার বিষয় হলো, গ্যাবার্ড জনসমক্ষে দেওয়া ভাষণে এই অংশটি এড়িয়ে গেলেও ডেমোক্র্যাট সিনেটরদের জেরার মুখে তিনি তথ্যের সত্যতা অস্বীকার করতে পারেননি। সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার এটিকে ‘প্রেসিডেন্টের ভুল তথ্যকে আড়াল করার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
এদিকে, ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্ট এই যুদ্ধের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম হাই-প্রোফাইল কর্মকর্তা হিসেবে কেন্ট তাঁর পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, ‘ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না। এই যুদ্ধে জড়ানো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।’
কেন্টের এই পদত্যাগ ট্রাম্পের কট্টর সমর্থকদের মধ্যেও বিভাজন তৈরি করেছে। কারণ কেন্ট নিজেও ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের কারণে একসময় তাঁকে সমর্থন করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো সার্বভৌম দেশের ওপর হামলা চালাতে হলে ‘আসন্ন হুমকি’ প্রমাণ করা বাধ্যতামূলক। গ্যাবার্ডের গোয়েন্দা রিপোর্ট যদি প্রমাণ করে যে ইরানের পরমাণু সক্ষমতা ইতিমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে, তবে ট্রাম্পের এই সামরিক পদক্ষেপ অবৈধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
একইভাবে, মার্কিন অভ্যন্তরীণ আইন অনুযায়ীও কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া প্রেসিডেন্ট কেবল আত্মরক্ষার স্বার্থে তাৎক্ষণিক হামলা চালাতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধের কোনো একক ও সুনির্দিষ্ট যৌক্তিকতা (যেমন-পরমাণু অস্ত্র, ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ১৯৭৯ সালের বিপ্লব) দেখাতে না পারায় ট্রাম্প প্রশাসনের আইনি ভিত্তি এখন নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
অপরদিকে একসময় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ঘোর বিরোধী থাকলেও, বর্তমানে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুলসী গ্যাবার্ড এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেন, ‘কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে ট্রাম্পই নির্ধারণ করবেন কোনটি হুমকি আর কোনটি নয়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, গোয়েন্দা তথ্যের এই লুকোচুরি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনকে এক গভীর সংকটে ফেলেছে। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও কাতারের মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে, অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ভেতরে এই যুদ্ধের বৈধতা নিয়ে আইনি লড়াই তীব্র হচ্ছে।