হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

শিশুদের টিকার সংখ্যা কমিয়ে দিতে চান ট্রাম্প, নির্বাহী আদেশে সই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

শিশুদের টিকার সংখ্যা কমাতে একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ছাড়াও এই আদেশে হাম, মাম্পস ও রুবেলা প্রতিরোধী ‘এমএমআর’ (MMR) টিকা তিনটি পৃথকভাবে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেছে।

ট্রাম্প বলেন, কয়েক দশক আগে শিশুরা এখনকার তুলনায় খুব সামান্য পরিমাণ টিকা পেত। সেই সময় মানুষ অনেক বেশি সুস্থ ছিল। আর এখন অটিজমের যে উচ্চ হার দেখা যাচ্ছে, তখন তা ছিল না।

দীর্ঘদিন ধরেই এমএমআর টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে আসছেন ট্রাম্প। যদিও একাধিক গবেষণায় এই টিকার সঙ্গে অটিজমের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

নতুন আদেশে শিশুদের জন্য সুপারিশ করা টিকার সংখ্যা কমিয়ে ১৮ থেকে ১১ করার কথাও বলা হয়েছে। বর্তমানে আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস (এএপি) ১৮টি টিকা দেওয়ার সুপারিশ করে।

তবে নতুন সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা ফেডারেল সরকারের নেই। স্কুলে ভর্তি বা উপস্থিতির জন্য যেসব টিকা বাধ্যতামূলক, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় অঙ্গরাজ্য সরকারগুলো।

সোমবার ওভাল অফিসে ট্রাম্প বলেন, তাঁর প্রশাসন ‘সবচেয়ে গুরুতর ও বিপজ্জনক’ রোগের বিরুদ্ধে মাত্র ১১টি মূল টিকার ক্ষেত্রে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ শিশু টিকা দেওয়ার সুপারিশ গ্রহণ করছে।

এই আদেশের অধীনে শিশুদের জন্য যে টিকাগুলো সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো হলো— হাম, মাম্পস, রুবেলা, ডিপথেরিয়া, টিটেনাস, পারটুসিস, পোলিও, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি, নিউমোকোকাল ডিজিজ, হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস এবং ভ্যারিসেলা বা জলবসন্ত।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা টিকার সংখ্যা কমাচ্ছি। শুধু যে কম টিকা বা ইনজেকশন দেওয়া হবে তা-ই নয়, এগুলো চিকিৎসকের কাছে একাধিকবার গিয়ে ধাপে ধাপে দিতে হবে।’

এমএমআর টিকা একসঙ্গে দেওয়া হলে তা ‘প্রাণঘাতী’ হতে পারে বলে মনে করেন ট্রাম্প। তিনি বিষয়টিকে একটি শিশুর শরীরে এক বোতল সোডা (কোমল পানীয়) ঢেলে দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।

এক সাংবাদিক তাঁর এই দাবির পক্ষে প্রমাণ জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যা শুনেছি, তা হলো, কিছু মানুষ এমনটাই বলে থাকেন।’

সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে এমএমআর টিকার কারণে জ্বরজনিত খিঁচুনির ঝুঁকি খুবই সামান্য। যেসব শিশুর গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া বা দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসহ কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে, তাদের টিকা নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।

সিডিসি বলছে, এমএমআর টিকা নেওয়া অধিকাংশ মানুষেরই কোনো গুরুতর সমস্যা হয় না। হাম, মাম্পস বা রুবেলায় আক্রান্ত হওয়ার তুলনায় টিকা নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ।

সমন্বিত এমএমআর টিকাকে তিনটি আলাদা টিকায় ভাগ করে দেওয়ার কোনো উপকারিতা রয়েছে এমন কোনো প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই বলেও জানিয়েছে সিডিসি।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার ডোজগুলোর মধ্যে সময়ের ব্যবধান রাখা হলে এই সময়ে শিশুদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। একাধিকবার টিকা দেওয়ার জন্য চিকিৎসকের কাছে যেতে হলে নির্ধারিত কোনো একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাদ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

ট্রাম্পের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়র বলেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো অভিভাবকদের পছন্দের সুযোগ দেওয়া, শিশুদের টিকা নেওয়ার সুযোগ বন্ধ করা নয়।

২০২৫ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কেনেডি টিকা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পরিবর্তন ও শিথিল করার চেষ্টা করছেন। গত সপ্তাহে সিএনএনে এক সাক্ষাৎকারে কেনেডি জোর দিয়ে বলেন, তিনি ‘কখনোই এমএমআর টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি’।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন আদেশের অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের শিশুরা আগের টিকা সূচি অনুযায়ী সুপারিশ করা ৭২টি ডোজের তুলনায় অনেক কম টিকা পাবে। এই ৭২টি ডোজের হিসাবের মধ্যে প্রতিবছর ফ্লু ও কোভিড-১৯-এর টিকাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের সভাপতি অ্যান্ড্রু র‍্যাসিন বলেছেন, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশটি ‘বিপজ্জনক’ এবং ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ডের বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের’ ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়।

র‍্যাসিন আরও বলেন, ‘টিকা নেওয়া পিছিয়ে দেওয়া বা বাদ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে যখন হাম ছড়িয়ে পড়ছে এবং শিশুরা স্কুলে ফিরছে।’

কেনেডিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে অনুমোদনের সময় সিনেটে তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সিদ্ধান্ত নির্ধারণকারী ভোটার ছিলেন রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি। ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের সমালোচনা করে একে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।

পেশায় চিকিৎসক ক্যাসিডি সোশ্যাল মিডিয়া এক্স-এ লিখেছেন, ‘প্রেসিডেন্টের এসব পরিবর্তন করার মতো বিশেষজ্ঞ জ্ঞান নেই। টিকা অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর। টিকা কখনোই অটিজমের কারণ হতে পারে না।’

বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, শিশুদের টিকার সঙ্গে অটিজমের যোগসূত্র রয়েছে, এমন একটি বৈজ্ঞানিকভাবে অপ্রমাণিত ধারণার কারণে অভিভাবকেরা যদি সন্তানদের টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকেন, তাহলে হামের মতো রোগ আবার ব্যাপকভাবে ফিরে আসার ঝুঁকি তৈরি হবে।

একাধিক গবেষণায় এমএমআর টিকার সঙ্গে অটিজমের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি। ২০১৯ সালে ডেনমার্কে পরিচালিত একটি উচ্চমানের গবেষণায় ৬ লাখ ৫৭ হাজার ৪৬১ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়, প্রাপ্ত ডেটা এমএমআর টিকা অটিজমের কারণ বা অনুঘটক হওয়ার বিষয়টিকে সমর্থন করে না।

সিডিসি তাদের ওয়েবসাইটে শিশুদের সম্মিলিত এমএমআর টিকার দুটি ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করেছে। প্রথম ডোজ দিতে বলা হয়েছে ১২ থেকে ১৫ মাস বয়সের মধ্যে এবং দ্বিতীয় ডোজ ৪ থেকে ৬ বছর বয়সের মধ্যে।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শিশুদের কখন এবং কতগুলো টিকা দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয় শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কখন সবচেয়ে কার্যকর থাকে এবং তারা কখন নির্দিষ্ট রোগের ঝুঁকিতে থাকে তার ওপর ভিত্তি করে।

সংস্থাটি আরও বলছে, সুপারিশকৃত টিকাদান বিলম্বিত বা বাদ দেওয়ার কোনো চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই।

প্রাকৃতিক উপায়ে মাটি, পানি ও খাবারে পাওয়া যায় এমন স্বল্পমাত্রার অ্যালুমিনিয়াম সল্ট দশকের পর দশক ধরে কিছু টিকায় ব্যবহার করা হচ্ছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উদ্দীপিত করতে সাহায্য করে।

ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে টিকায় ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের বিকল্প উপাদান তৈরির কথাও বলা হয়েছে। এসব বিকল্প অ্যালুমিনিয়ামের চেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

তবে এএপি বলছে, গবেষণায় দেখা গেছে, টিকায় থাকা অতি সামান্য পরিমাণ অ্যালুমিনিয়াম লবণের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।