ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়েছিল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কাছে। তিনি সরাসরি বলে দেন, এটিকে যুদ্ধ বলাই যায় না। তবে এর শেষ কবে সেটিও জানেন না তিনি। এদিকে এই যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধটি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স এই যুদ্ধের পরিণতি বা প্রভাবকে তুচ্ছ করে দেখানোর চেষ্টা করেন। এমনকি এই সংঘাতকে কী নামে অভিহিত করা উচিত, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ভ্যান্স বলেন, ‘আমি এটিকে যুদ্ধ বলব না। এই মুহূর্তে কোনো সক্রিয় গোলাগুলি হচ্ছে না।’
এরপর তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমি স্বীকার করি, এমন কিছু জায়গা রয়েছে, যেখানে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক দিন ধরে চলা তীব্র হামলা-পাল্টা হামলার পর ভ্যান্সের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এলো। তা সত্ত্বেও ভ্যান্স দাবি করেন যে মূল সামরিক অভিযান কেবল ‘প্রায় ছয় সপ্তাহ’ স্থায়ী ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করতে সফল হয়েছে।
যুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালীর দিকেও মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করেন ভ্যান্স। গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার জন্য তিনি ইরানকে দায়ী করেন।
সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, ‘আপনি যখন প্রশ্ন করেন, “এটি কবে শেষ হবে? ”, তখন আসলে আমাকে এমন একটি প্রশ্ন করছেন—ইরানিরা কবে জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করবে?’
তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, ওই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। আপনাকে ইরানিদেরই জিজ্ঞাসা করতে হবে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। কিন্তু ওই মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম দফায় হামলা চালানোর পর ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য জলপথটি বন্ধ করে দেয়। এতে বিশ্ববাণিজ্যে বড় ধাক্কা লাগে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হতো। তবে ভ্যান্সের দাবি, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বাড়ানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে সহায়তা করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার ৬ হাজার ৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের মজুদের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের নতুন একটি চুক্তি বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতে সহায়তা করবে।
ভ্যান্স বলেন, ‘ইরানিরা কবে জাহাজে গুলি চালানো বন্ধ করবে এবং এর প্রভাব বিশ্ববাজারে পড়া বন্ধ হবে? এর উত্তর হলো, দিন দিন এর প্রভাব কমছে।’
যুদ্ধে আরও বেশি অবদান না রাখায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরও ভর্ৎসনা করেন ভ্যান্স। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাই জ্বালানি সংকট ঠেকাচ্ছেন বলে প্রশংসা করেন। ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এখন যা করছি, তা হলো বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা, যাতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা না দেয়। আমরা এখন জ্বালানি সংকটে পড়িনি শুধু প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের কারণে নয়, আমাদের সামরিক বাহিনীর চমৎকার কাজের কারণেও।’
ইরানে বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ভ্যান্স বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। তবে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে হামলাটির বিষয়ে দেওয়া বর্ণনা নিয়ে তিনি ‘অত্যন্ত সন্দিহান’ বলেও মন্তব্য করেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ভ্যান্স বলেন, ‘আমরা এটি তদন্ত করছি, কারণ স্পষ্টতই আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা জানতে চাই। আমাদের সামরিক বাহিনী যখন ভুল করে, তখন তারা সেই ভুল থেকে শিক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করার চেষ্টা করে।’
ওই হামলায় শিশুসহ অন্তত পাঁচজন নিহত এবং আরও প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
তবে মানবাধিকারকর্মীরা উল্লেখ করেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় অতীতেও যুক্তরাষ্ট্র হামলার দায় অস্বীকার করেছে। এসব হামলার শিকার ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও খুবই সীমিত।
এই ঘটনার বিষয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা ‘কখনোই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে না’।
যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিমান হামলায় ১৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায়ও দায় অস্বীকার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল স্কুলশিক্ষার্থী। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের পর্যালোচনা করা প্রমাণে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।