যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় গত বছরের ভয়াবহ ইটন দাবানলে ১৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল হাজার হাজার ঘরবাড়ি। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার সাধারণ মানুষ যখন এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ট্রমা ও ক্ষয়ক্ষতি সামলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই কিছু মানুষ মেতে উঠেছিল এক বীভৎস খেলায়। পলিমার্কেটের মতো বহুল পরিচিত অনলাইন প্রেডিকশন মার্কেট বা ভবিষ্যদ্বাণীভিত্তিক বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে তখন রীতিমতো বাজি ধরা হচ্ছিল যে—এই দাবানলে ঠিক কত একর জমি পুড়বে, আগুন কোন কোন এলাকায় ছড়াবে কিংবা কখন তা নিয়ন্ত্রণে আসবে।
আজ শুক্রবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে। তবে বিষয়টি বিশ্বজুড়ে নীতিশাস্ত্রবিদ ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দাবানল নিয়ে এমন আর্থিক বাজির চল থাকলে তা মুনাফালোভী অপরাধীদের ইচ্ছাকৃতভাবে বনাঞ্চলে আগুন লাগানোর মতো অপরাধ করতে প্ররোচিত করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে বর্তমান বিশ্বে দাবানল, তীব্র দাবদাহ ও হারিকেনের মতো চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এই দুর্যোগগুলোকেই এখন কোটি কোটি ডলারের বাজি ধরার হাতিয়ার বানিয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রেডিকশন মার্কেট অ্যাপ।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের বিজ্ঞানী ক্যাটলিন ট্রুডো একে একটি ‘অমানবিক ও অন্ধকার ভবিষ্যৎ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জানান, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তির কল্যাণে এখন যেকোনো বনাঞ্চলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া যেমন সহজ, তেমনি এসব অ্যাপের কারণে এর পেছনে একটি বিশাল আর্থিক প্রলোভনও যুক্ত হয়েছে।
পলিমার্কেট বা ওয়াইল্ডফায়ারের মতো সাইটগুলোতে ব্যবহারকারীরা মূলত কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার পক্ষে বা বিপক্ষে ডিজিটাল শেয়ার কেনেন বা বাজি ধরেন। যদি কোনো ঘটনার পক্ষে বাজির দর বেশি থাকে, তবে সেটির সম্ভাবনা তত বেশি বলে ধরে নেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করা ব্যক্তিরা প্রতি শেয়ারে মোটা অঙ্কের অর্থ বা মুনাফা লাভ করেন। যদিও পলিমার্কেট কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের এই প্ল্যাটফর্ম জুয়া নয়, বরং দুর্যোগের সময় সবচেয়ে নির্ভুল ও দ্রুত তথ্য পাওয়ার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। এটি ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা হয়।
তবে অপরাধবিজ্ঞানী ও অগ্নিকাণ্ড তদন্তকারীরা এই যুক্তির সঙ্গে একেবারেই একমত নন। লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত আর্সন ইনভেস্টিগেটর ও প্রোফাইলার এড নর্ডসকগ বলেন, ভূমিকম্প বা হারিকেনের ওপর মানুষের হাত না থাকলেও দাবানল এমন একটি দুর্যোগ, যা মানুষ সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে কেউ চাইলেই একটা দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে বিশাল বনে আগুন ধরিয়ে দিতে পারে।
নর্ডসকগ তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, জুয়াড়িদের মানসিকতার সঙ্গে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক রয়েছে এবং এই ধরনের অ্যাপ মানুষের বিবেককে অবশ করে দিচ্ছে। এমনকি বড় অঙ্কের বাজি জেতার জন্য কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ফায়ার সার্ভিসের কর্মীও ইচ্ছা করে আগুন নেভাতে দেরি করতে পারেন, যাতে পুড়ে যাওয়া জমির পরিমাণ বাজির শর্তের সঙ্গে মিলে যায়।
এই আশঙ্কার একটি বড় প্রমাণ মিলেছে ফ্রান্সের প্যারিসের শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে। সেখানে পলিমার্কেটের একটি দাবদাহসংক্রান্ত বাজির মোটা অঙ্কের টাকা জিততে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তি বিমানবন্দরের স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া সেন্সরের সামনে হেয়ার ড্রায়ার বা অন্য কোনো কৃত্রিম উপায়ে তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনায় ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা মেতেও-ফ্রান্স ইতিমধ্যেই পুলিশের কাছে একটি অভিযোগ করেছে।
এই চরম অনৈতিক বাজির বাজার নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক সাইকোলজির অধ্যাপক থেরেসা গ্যানন ও সান্তা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিশাস্ত্রের পরিচালক অ্যান স্কিট। তাঁরা বলছেন, মানুষের মৃত্যু, দুর্ভোগ বা ঘরবাড়ি ধ্বংসের ওপর বাজি ধরা মানবজীবনের মূল্যকে চরমভাবে অবমূল্যায়ন করে। এটি মানুষের মন থেকে দুর্যোগের ভয়াবহতাকে মুছে দিয়ে বিষয়টিকে একটি ভিডিও গেমের মতো বিনোদনে পরিণত করছে, যার ফলে জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে সামাজিক সচেতনতা তৈরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে কলাম্বিয়া বিজনেস স্কুলের নিউরোসায়েন্টিস্ট মোরান সার্ফ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে যারা বিশ্বাস করে না, তারা যখন এই দুর্যোগের ওপর বাজি ধরে টাকা হারবে বা জিতবে, তখন অবচেতনভাবেই তারা জলবায়ু সংকটের সত্যতাকে মেনে নিতে বাধ্য হবে। কিন্তু এই সামান্য সুবিধার চেয়ে এর অপকারিতাই বেশি।
ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট স্কুলের অর্থনীতিবিদ কিম কাইভান্তোর মতে, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ থাকলে বিশেষজ্ঞভিত্তিক প্রেডিকশন মার্কেট জলবায়ুঝুঁকির পূর্বাভাসে কার্যকর হতে পারে। তিনি ‘ক্রুসিয়াল’ নামে একটি বিশেষজ্ঞভিত্তিক প্রেডিকশন মার্কেট পরিচালনা করেন। সেখানে অংশগ্রহণকারীরা অর্থ দিয়ে নয়, বরং সঠিক তথ্য দেওয়ার ভিত্তিতে ‘ক্রেডিট’ অর্জন করেন। তবে দাবানলের ক্ষেত্রে এমন বাজার আদৌ নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দিতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির ওয়াইল্ডফায়ার ইন্টারডিসিপ্লিনারি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ক্রেইগ ক্লেমেন্টস বলেন, দাবানলের বিস্তার বহু জটিল উপাদানের ওপর নির্ভর করে। তাই বাজিভিত্তিক বাজার পূর্বাভাসকে কতটা উন্নত করতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বন বিভাগ (ইউএস ফরেস্ট সার্ভিস) ও ক্যালিফোর্নিয়ার ফায়ার সার্ভিস বিভাগ জানিয়েছে, তারা এই ধরনের জুয়া বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি কোনো তথ্য তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না।
এদিকে এই অনিয়ন্ত্রিত বাজির বাজার রুখতে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম গত মার্চে রাজ্যের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রেডিকশন মার্কেটে ইনসাইডার ট্রেডিং-বিরোধী বিধিনিষেধ আরও কঠোর করেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া ও উটাহ অঙ্গরাজ্যের কয়েকজন আইনপ্রণেতা যৌথভাবে এমন একটি বিল উত্থাপন করেছেন, যাতে সন্ত্রাসবাদ, হত্যাকাণ্ড, যুদ্ধ, জুয়া বা অবৈধ কর্মকাণ্ড-সংক্রান্ত ঘটনার ওপর লেনদেন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে।
তবে নিয়ন্ত্রণের এসব উদ্যোগের মধ্যেও খাতটি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। জলবায়ুজনিত প্রাণঘাতী দুর্যোগ নিয়েও অর্থের বিনিময়ে পূর্বাভাসভিত্তিক লেনদেন অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের প্যালিসেডস দাবানল-সংক্রান্ত একটি পলিমার্কেট লেনদেনের মন্তব্যে এক ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, ‘দারুণ মজা হলো। সবাইকে ধন্যবাদ। আবার পরেরবার দেখা হবে।’