যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে স্বাস্থ্যসেবা খাতে ৬ কোটি ৪ লাখ (৬৪ মিলিয়ন) ডলারের বিশাল অর্থ জালিয়াতি ও অবৈধ ঘুষ লেনদেনের দায়ে জাকিয়া খান নামে এক নারীকে ৭৬ মাসের (৬ বছর ৪ মাস) কারাদণ্ড দিয়েছেন মার্কিন ফেডারেল আদালত। স্থানীয় সময় বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ব্রুকলিনের ডিস্ট্রিক্ট বিচারক নাতাশা সি মার্লে এই রায় ঘোষণা করেন। জাকিয়া খান একজন বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশিদের জন্য বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা করতেন তিনি।
দণ্ডপ্রাপ্ত জাকিয়া খান ব্রুকলিনের কোনি আইল্যান্ড এলাকায় দুটি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র (সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার) ও একটি হোম হেলথ কেয়ার সেবা প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন।
জালিয়াতির অপরাধে কারাদণ্ডের পাশাপাশি আদালত জাকিয়া খানকে ৫ কোটি ৬০ লাখ (৫৬ মিলিয়ন) ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত দুই স্থাবর সম্পত্তি, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকারসহ মোট ৫০ লাখ ডলার সমমূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে জাকিয়া খান আদালতে স্বাস্থ্যসেবা খাতের জালিয়াতি চক্রান্ত এবং সরকারের সঙ্গে প্রতারণা ও ঘুষ লেনদেনের দায় স্বীকার করেন।
আদালতের নথি থেকে জানা যায়, ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সুদীর্ঘ সাত বছর ধরে এই বিপুল অঙ্কের প্রতারণা চালানো হয়। জাকিয়া খানের মালিকানাধীন দুটি ডে কেয়ার সেন্টার—‘হ্যাপি ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার’ ও ‘ফ্যামিলি সোশ্যাল অ্যাডাল্ট ডে কেয়ার সেন্টার’—এবং ‘রেসপনসিবল কেয়ার স্টাফিং’ নামের একটি হোম হেলথ কেয়ার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই অপরাধ সংঘটিত হয়।
প্রতারণার কৌশলে একদল দালাল বা মার্কেটারে মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মেডিকেইড গ্রহীতাদের প্রলোভন দেখানো হতো। বিনিময়ে ওই গ্রহীতাদের ভুয়া উপস্থিতি পত্রে সই করিয়ে নেওয়া হতো। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের কোনো ধরনের স্বাস্থ্য বা সামাজিক সেবা প্রদান করা হয়নি। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্য বিমা কর্মসূচি ‘মেডিকেড’-এর কাছে এই সেবার বিপরীতে পূর্ণ অর্থ দাবি করে ভুয়া বিল জমা দেওয়া হতো।
তদন্তকারীদের মতে, এই চক্রটি সরকারি তহবিলের অর্থ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করতে এবং দালাল ও গ্রহীতাদের ঘুষ দিতে একাধিক ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) করেছিল। ছদ্মবেশী তদন্তে জাকিয়া খানের নিজের কার্যালয়ে বসে ঘুষের টাকা বিতরণ করার রেকর্ডও করা হয়।
সব মিলিয়ে হ্যাপি ফ্যামিলি ও ফ্যামিলি সোশ্যাল ডে কেয়ার সেন্টার দুটি সরকারের কাছে ৬ কোটি ৪ লাখ ডলারের ভুয়া বিল জমা দেয়। এর বিপরীতে মেডিকেড প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার পরিশোধ করে।
মামলার রায় ঘোষণার পর ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের ভারপ্রাপ্ত ইউএস অ্যাটর্নি জোসেফ নোসেলা জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আজকের এই রায় আমাদের বিচার বিভাগ থেকে প্রতারকদের প্রতি এক কঠোর সতর্কবার্তা। আমেরিকার করদাতাদের অর্থ আত্মসাৎকারী যেকোনো দুর্নীতিবাজ স্বাস্থ্যসেবা পরিচালকের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর আইনগত ব্যবস্থা বজায় রাখব।’
তদন্তকারী সংস্থা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই)-এর নিউইয়র্ক কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত বিশেষ এজেন্ট ইন চার্জ পিট জিজাস বলেন, ‘সবচেয়ে অসহায় ও প্রবীণ নাগরিকদের সেবার জন্য বরাদ্দকৃত মেডিকেডের কোটি কোটি ডলার জাকিয়া খান ও তাঁর সহযোগীরা নিজেদের পকেটে পুরেছেন। আজকের এই রায় প্রমাণ করে, আমরা প্রতারকদের বিরুদ্ধে অপরাধের শেষ দেখে ছাড়ব।’
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াইপিডি) কমিশনার জেসিকা এস টিশ জাকিয়া খানের এই কর্মকাণ্ডকে ‘গভীরভাবে অবৈধ ও নৈতিকতাহীন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘সরকারি জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়া বরদাশত করা হবে না।’
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান সার্ভিসেসের প্রতিনিধি মিরান্ডা এল বেনেট জানান, প্রবীণদের সহায়তার জন্য নির্মিত সরকারি ব্যবস্থা লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনি পদক্ষেপে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অফিস অব ইন্সপেক্টর জেনারেল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস এবং নিউইয়র্ক পুলিশ যৌথভাবে এই জটিল আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক জালিয়াতির তদন্ত পরিচালনা করে। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিসের জাতীয় ফ্রড এনফোর্সমেন্ট ডিভিশন ও ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউইয়র্কের প্রসিকিউটররা আদালতে সরকারের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন।
উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সুবিধা কর্মসূচিতে অপচয়, জালিয়াতি ও দুর্নীতি বন্ধে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্সের অধীনে এই ধরনের স্বাস্থ্যসেবা জালিয়াতির বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ