হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

আটলান্টিকের ওপারে রাশিয়ার ‘নিউমোনিক প্লেগ’ নিয়ে কেন উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

সাইবেরিয়ার ইরকুটস্ক রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে গবেষণারত কর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ায় নিউমোনিক প্লেগের সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রয়োজন হলে রাশিয়াকে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় সময় গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তিনি ‘খুব শিগগিরই’ কথা বলবেন। এর আগে সোমবার সম্ভাব্য প্লেগের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের সাহায্য করব। যতটা সম্ভব, আমরা তাদের সাহায্য করব।’

তবে রাশিয়ায় নিউমোনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ঘটনাটির সূত্রপাত দারিয়া শিপিলোভা নামে রাশিয়ার এক ল্যাবকর্মীর মৃত্যুকে ঘিরে। রুশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইবেরিয়ার রিসার্চ অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে কাজ করার সময় তিনি প্লেগের ব্যাকটেরিয়া থাকা একটি টেস্ট টিউব ভেঙে ফেলেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে গুরুতর নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১ অক্টোবর রাত থেকে ২ অক্টোবরের মধ্যে তার মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

তবে শিপিলোভার মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি ‘অজ্ঞাত কারণের নিউমোনিয়ায়’ মারা গেছেন এবং পরীক্ষায় তাঁর কর্মস্থলে থাকা কোনো জীবাণুর সঙ্গে তার অসুস্থতার সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।

সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে রুশ কর্তৃপক্ষ আশপাশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে কোয়ারেন্টিন জারি করেছে। শিপিলোভার সংস্পর্শে আসতে পারেন এমন প্রায় ২০০ জনকে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচটি হাসপাতাল এখনো কোয়ারেন্টিনে রয়েছে। এর মধ্যে একটি শিশু হাসপাতাল এবং একটি মাতৃসদন রয়েছে।

রুশ জনস্বাস্থ্য সংস্থার দাবি, কোয়ারেন্টিনে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো সংক্রামক রোগ বা অসুস্থতার খবর পাওয়া যায়নি। ওই অঞ্চলের মহামারি পরিস্থিতিও স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি

মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) পররাষ্ট্র দপ্তর এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর রাশিয়ার কাছে ঘটনাটি সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা হলে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েই প্লেগের চিকিৎসা করা সম্ভব।

ইউরোপীয় কমিশনও পরিস্থিতিটি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এখনো ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে সংক্রমণের প্রমাণ নেই

নিউমোনিক প্লেগ প্লেগ রোগের সবচেয়ে গুরুতর ধরন। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা অন্য ব্যক্তির মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাধারণত সংক্রমণের ১ থেকে ৩ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তবে শিপিলোভা নিউমোনিক প্লেগে আক্রান্ত হয়ে থাকলেও তার মাধ্যমে অন্য কারও মধ্যে রোগটি ছড়িয়েছে, এমন কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্লেগ সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শ অথবা সংক্রমিত ইঁদুরের শরীরে থাকা আক্রান্ত মাছির কামড়ের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে।

ঘটনাটি নিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মধ্যে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। শিপিলোভা কোথায় সংক্রমিত হয়েছিলেন, তিনি সত্যিই প্লেগের জীবাণুর সংস্পর্শে এসেছিলেন কি না এবং কথিত ল্যাব দুর্ঘটনা আদৌ ঘটেছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

ইরকুতস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ বলেছেন, একজন বাসিন্দা ‘বিশেষভাবে বিপজ্জনক কোনো সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন।’ তবে তিনি সরাসরি নিউমোনিক প্লেগের কথা বলেননি।

এদিকে বুরিয়াতিয়ার গভর্নর আলেক্সেই তিস্যদেনভ শিপিলোভা ওই অঞ্চলে গিয়েছিলেন এমন খবর অস্বীকার করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন, সেখানে প্লেগের কোনো প্রাদুর্ভাব নেই।

কেন উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র

নিউমোনিক প্লেগ চিকিৎসাযোগ্য হলেও দ্রুত চিকিৎসা না হলে এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী হতে পারে। এ ছাড়া ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস বা যে ব্যাকটেরিয়া প্লেগ সৃষ্টি করে, তার জৈবিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। ফলে রাশিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাগারে সম্ভাব্য দুর্ঘটনার খবর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাড়তি সতর্কতা তৈরি করেছে।

তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতিকে কোনো নতুন আন্তর্জাতিক মহামারি হিসেবে দেখার মতো প্রমাণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ মূলত সম্ভাব্য সংক্রমণ, মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার প্রকৃত উৎস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষায় রয়েছে।

ট্রাম্পের ভাষায়, ‘আমরা তাদের সাহায্য করব।’ এখন সেই সহায়তার প্রয়োজন হবে কি না, তা নির্ভর করছে রাশিয়ার তদন্তে শিপিলোভার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের বিষয়ে কী তথ্য সামনে আসে তার ওপর।