হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

যে জীবন ছেড়ে গেলেন টেড টার্নার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

বিশ্ব গণমাধ্যমের ইতিহাসে এক বিপ্লবী অধ্যায়ের নাম টেড টার্নার। ২৪ ঘণ্টার সংবাদ সম্প্রচারের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে যিনি বদলে দিয়েছিলেন টেলিভিশন সাংবাদিকতার গতিপথ, সেই দূরদর্শী উদ্যোক্তা, দাতা ও পরিবেশ-কর্মী টার্নার ৮৭ বছর বয়সে বুধবার (৬ মে) মৃত্যুবরণ করেছেন। পরিবারের সদস্যদের ঘিরে তাঁর জীবনের শেষ সময়টি কেটেছে বলে জানিয়েছে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম সিএনএন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে জন্ম নেওয়া এই ব্যবসায়ী পরবর্তীকালে আটলান্টাকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল এক মিডিয়া সাম্রাজ্য। স্পষ্টভাষী ও সাহসী স্বভাবের জন্য তিনি ‘মাউথ অব দ্য সাউথ’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সিএনএন-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই। এই নেটওয়ার্কই প্রথমবারের মতো বিশ্বকে দেয় ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন সংবাদ সম্প্রচার।

শোক থেকে উচ্চাকাঙ্ক্ষা

টার্নারের জীবনের ভিত তৈরি হয়েছিল এক কঠিন বাস্তবতায়। ১৯৬৪ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে বাবার আত্মহত্যার পর তাঁর হাতে আসে পারিবারিক বিজ্ঞাপন ব্যবসা। এই ট্র্যাজেডি তাঁকে ভেঙে দেয়নি, বরং এক ধরনের অদম্য তাড়নায় সামনে ঠেলে দেয়।

শুরুটা ছিল বিলবোর্ড ব্যবসা দিয়ে। কিন্তু তিনি দ্রুত বুঝে ফেলেন—মিডিয়াই ভবিষ্যৎ। রেডিও থেকে টেলিভিশনে, আর সেখান থেকে স্যাটেলাইট—প্রতিটি ধাপে তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন এবং প্রায় প্রতিবারই জিতেছেন।

১৯৭০ সালে তিনি আটলান্টার একটি দুর্বল টিভি চ্যানেল কিনে নিয়েছিলেন এবং পুরোনো সিনেমা ও সিটকম দেখিয়ে সেটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। এরপর ১৯৭৬ সালে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এই চ্যানেলটিকে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রচার করে কেবল টিভির প্রথম ‘সুপারস্টেশনে’ পরিণত করেন।

‘পাগলামি’ থেকে বিপ্লব

টেড টার্নারের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল সংবাদকে সময়ের সীমা থেকে মুক্ত করা। ১৯৮০ সালের ১ জুন যখন সিএনএন সম্প্রচার শুরু করে, তখন অনেকে এটিকে ‘পাগলামি’ বলেই মনে করেছিলেন। কারণ, তখনকার ধারণা ছিল—সংবাদ নির্দিষ্ট সময়েই প্রচারিত হবে, সারাক্ষণ নয়।

কিন্তু টার্নারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীতে যখনই ঘটনা ঘটুক, মানুষ তা সঙ্গে সঙ্গেই জানতে চায়। তাঁর ভাষায়, ‘অনেকেই আমার মতো—সংবাদ মিস করে ফেলে। কারণ তা নির্দিষ্ট সময়েই শেষ হয়ে যায়।’

১৯৮০ সালে সিএনএন-এর কন্ট্রোল রুমে টেড টার্নার। ছবি: সিএনএন

এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় সিএনএন—যা পরে বিশ্বজুড়ে ১৫০ টিরও বেশি দেশে দর্শকদের কাছে সারা বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহকে ‘লাইভ’ অভিজ্ঞতায় পরিণত করে। এই অবদানের জন্য ১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘বর্ষসেরা ব্যক্তি’ ঘোষণা করে।

পর্দার আড়ালের মানুষটি

টার্নার শুধু একজন ব্যবসায়ী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক অদ্ভুত মিশ্রণের মানুষ। একই সঙ্গে দুঃসাহসী, আবেগপ্রবণ, আবার কখনো বেপরোয়া। সিএনএনের শুরুর দিনগুলোতে তিনি অফিসেই থাকতেন, কখনো সোফায় ঘুমাতেন, কখনো বাথরোব পরেই নিউজরুমে হাজির হয়ে যেতেন।

সিএনএন সফল হওয়ার পরও টার্নার থেমে থাকেননি। তিনি আরও কয়েকটি চ্যানেল চালু করেন—যেমন সিএনএন ইন্টারন্যাশনাল, টার্নার নেটওয়ার্ক টেলিভিশন, টার্নার ক্ল্যাসিক মুভিজ এবং কার্টুন নেটওয়ার্ক।

একই সঙ্গে তিনি পুরোনো চলচ্চিত্র সংগ্রহ করে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। যদিও সাদা-কালো সিনেমা রঙিন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের মুখেও পড়েন, বিশেষ করে কাসাব্লাংকা-এর মতো ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্রে।

১৯৮০ সালে ২৪-ঘণ্টার সংবাদ নেটওয়ার্কটির উদ্বোধনের সময় টার্নার। ছবি: সিএনএন

যুদ্ধ, ইতিহাস ও লাইভ টেলিভিশন

১৯৯০ সালের পার্সিয়ান উপসাগরীয় যুদ্ধ ছিল সিএনএন-এর জন্য একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। প্রথমবারের মতো একটি যুদ্ধ সরাসরি টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হয় এবং তা একমাত্র সিএনএনেই দেখা যাচ্ছিল।

এই ঘটনা প্রমাণ করে দেয়, ২৪ ঘণ্টার সংবাদ নেটওয়ার্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অনেকেই এটিকে ইন্টারনেট বিপ্লবের মতোই বড় পরিবর্তন বলে আখ্যা দেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রাম

১৯৩৮ সালে জন্ম নেওয়া টার্নারের শৈশব ছিল কঠিন। কঠোর ও কখনো কখনো সহিংস বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল জটিল। তাঁর বোনের দীর্ঘ অসুস্থতা এবং মৃত্যু, বাবার আত্মহত্যা—এসব ঘটনা তাঁর মানসিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

তিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু করলেও শেষ করতে পারেননি। বাবার আপত্তির কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তবে এই সব অভিজ্ঞতা তাঁকে কঠোর, সাহসী এবং নিরলস পরিশ্রমী করে তোলে—যা তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের মূল শক্তি।

প্রেম, বিবাহ ও এক অস্থির হৃদয়

টার্নারের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নাটকীয়। তিনি মোট তিনবার বিয়ে করেন। প্রথমে জুডি নাই, পরে জেন শার্লি স্মিথ এবং সর্বশেষে হলিউড তারকা জেন ফন্ডা।

প্রথম দুই বিয়ে তাঁর জীবনের তুলনামূলক কম আলোচিত অধ্যায় হলেও, সেগুলোতেই গড়ে ওঠে তাঁর পারিবারিক ভিত্তি—সন্তান, দায়িত্ব এবং এক ধরনের ব্যক্তিগত স্থিতি। কিন্তু টার্নারের অস্থির, সর্বগ্রাসী কাজপাগল জীবনধারা সেই সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখতে পারেনি।

১৯৯৮ সালে নিউ মেক্সিকোতে নিজের র‍্যাঞ্চে একটি আদিবাসী আমেরিকান অনুষ্ঠানে টার্নার ও জেন ফন্ডা। ছবি: সিএনএন

জেন ফন্ডার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার। এ যেন দুই শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের মিলন, আবার সংঘর্ষও। এক দশক একসঙ্গে থাকার পর তাঁদের বিচ্ছেদ হয়, কিন্তু ভালোবাসা পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি কখনো।

ফন্ডা একবার বলেছিলেন, ‘একসঙ্গে থাকা কঠিন হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা মুছে যায় না।’

টার্নারের জীবন যেন এই কথারই প্রতিধ্বনি—তিনি অনেককে ভালোবেসেছেন, কিন্তু স্থির হতে পারেননি।

মানবকল্যাণ ও পরিবেশে অবদান

ব্যবসার পাশাপাশি টার্নার ছিলেন এক উদার দাতা। ১৯৯৭ সালে তিনি জাতিসংঘকে ১ বিলিয়ন ডলার দানের ঘোষণা দেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন ‘জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন’।

একসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত ভূমির মালিকদের একজন ছিলেন। মোটামুটি হিসাব অনুযায়ী—তাঁর মালিকানাধীন জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ একরেরও বেশি। এই বিশাল জমি ছড়িয়ে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে—বিশেষ করে মন্টানা, নেব্রাস্কা, নিউ মেক্সিকো, সাউথ ডাকোটা, কানসাস এবং কলোরাডোতে। এসব জমিতে তাঁর মালিকানায় ছিল অন্তত ২০ বড় বড় র‍্যাঞ্চ।

এই জমিগুলো শুধু সম্পদ হিসেবে নয়, তিনি ব্যবহার করেছেন পরিবেশ সংরক্ষণ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার কাজেও। বিশেষ করে বাইসন বা আমেরিকান বুনো মহিষ পুনরুদ্ধারে তিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তাঁর র‍্যাঞ্চগুলোতে একসময় বিশ্বের বৃহত্তম ব্যক্তিগত বাইসনের পাল (প্রায় ৫০ হাজারের বেশি) গড়ে উঠেছিল।

এ ছাড়া তাঁর জমির কিছু অংশ ছিল শিকার সংরক্ষণ এলাকা, কিছু অংশ কৃষি ও গবাদিপশু পালনের জন্য, আর কিছু ছিল একেবারে প্রাকৃতিক অবস্থায় সংরক্ষিত—যেখানে জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখা হয়েছে।

এ ছাড়াও তিনি ছিলেন পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের সমর্থক এবং পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয়। শিশুদের পরিবেশ সচেতন করতে তিনি তৈরি করেছিলেন জনপ্রিয় কার্টুন ‘ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট অ্যান্ড দ্য প্ল্যানেটিয়ার্স’।

শেষ জীবন

জীবনের শেষ দিকে টার্নার ডিমেনশিয়াতে আক্রান্ত হন। ২০২৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলেও পরে সেরে ওঠেন। মৃত্যুকালে তিনি রেখে গেছেন পাঁচ সন্তান, ১৪ নাতি-নাতনি এবং দুই প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী।

টেড টার্নারের জীবন ছিল সাহস, উদ্ভাবন ও ঝুঁকি নেওয়ার গল্প। তিনি শুধু একটি টিভি চ্যানেল তৈরি করেননি—তিনি বদলে দিয়েছেন মানুষ কীভাবে বিশ্বকে দেখে, বোঝে এবং অনুভব করে।

সিএনএনকে তিনি নিজের জীবনের ‘সবচেয়ে বড় অর্জন’ বলেছিলেন। আজও বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমে তাঁর প্রভাব স্পষ্ট।

সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা ও মিডিয়া মোগল টেড টার্নার আর নেই

চুক্তিতে রাজি না হলে এবারের হামলা হবে আরও ভয়াবহ: ট্রাম্প

এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকের খুব কাছাকাছি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, যা আছে এতে

ইরানে মার্কিন ‘আক্রমণ শেষ’, কেন পিছু হটছেন ট্রাম্প

লিমন ও বৃষ্টিকে মরণোত্তর পিএইচডি দিচ্ছে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়

ইরানের হামলার পরও হেগসেথ বললেন—যুদ্ধবিরতি শেষ হয়নি

জাহাজে হান্টাভাইরাসের সংক্রমণ মানুষ-মানুষেও ঘটেছে—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আশঙ্কা

চীনা অভিবাসীদের বহিষ্কারে ভিসা নিষেধাজ্ঞার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

সাংবাদিকতার শ্রেষ্ঠ সম্মান: এ বছর পুলিৎজার ট্রাম্পময়

মার্কিন জাহাজে হামলা করলে ইরানকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা হবে: ট্রাম্প