হোম > বিশ্ব > যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা

ঘনিষ্ঠদের নিয়ে গোপনে তুরস্ক ছাড়েন ট্রাম্প, অন্যরা থেকে যান আগের বিমানেই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

গত মাসে তুরস্কে আয়োজিত ন্যাটো সম্মেলন শেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক গোপন সামরিক বিমানে চেপে আঙ্কারা ছাড়েন। এ সময় তাঁর সফরসঙ্গী মন্ত্রিসভার দুই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে মূল বিমানেই রেখে যাওয়া হয়। সিবিএস নিউজের বরাতে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সম্ভাব্য হামলার হুমকির মুখে ট্রাম্পকে গোপনে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এয়ারফোর্স ওয়ানেই অবস্থান করছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ওই দিন (৮ জুলাই) আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে প্রেসিডেন্টের প্রাণের ভয়ে ছলনার আশ্রয় নেয় মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস। ট্রাম্প প্রথমে প্রকাশ্যে বড় বিমানটিতে উঠলেও পরে তাঁকে একটি ক্যাটারিং ট্রাকে লুকিয়ে ছোট আকারের সামরিক বিমানে (সি-৩২) স্থানান্তর করা হয়।

সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ট্রাম্পের বিমান পরিবর্তনের বিষয়টি জানতেন। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় প্রেসিডেন্ট নিহত বা অক্ষম হলে যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইন অব সাকসেশন’ (ক্ষমতার উত্তরাধিকারক্রম) অক্ষুণ্ন থাকে, সে জন্য তাঁরা মূল এয়ারফোর্স ওয়ানেই রয়ে যান। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স, হাউস স্পিকার, সিনেট প্রেসিডেন্টের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীই যথাক্রমে ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হন।

মূল এয়ারফোর্স ওয়ানে থেকে যাওয়া অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার ও যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেউং। সংবাদমাধ্যমের সদস্য ও অধিকাংশ কর্মীও ট্রাম্পের অনুপস্থিতির কথা না জেনে ওই বিমানেই সফর করেন।

অন্যদিকে, আঙ্কারা থেকে ট্রাম্পকে বহনকারী ছোট বিমানটিতে তাঁর সঙ্গে সফর করেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এ ছাড়া ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সহকারী নাটালি হার্প, ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ড্যান স্ক্যাভিনো ও ওভাল অফিস অপারেশনসের পরিচালক ওয়াল্ট নাউটা তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন।

বিমান পরিবর্তনের মূল কারণ ও হুমকি

সিবিসি নিউজ বিভিন্ন সূত্রের বরাতে তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আঙ্কারা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য ‘ম্যানপ্যাডস’ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ট্রাম্পের বিমানে হামলার তথ্য পান গোয়েন্দারা। বিষয়টি এতটাই গুরুতর ছিল যে, কর্মকর্তারা ট্রাম্পের মূল এয়ারফোর্স ওয়ান কিংবা কাতারের উপহার দেওয়া (বোয়িং ৭৪৭-৮) বিমান কোনোটিতেই তাঁর যাওয়া নিরাপদ মনে করেননি।

আঙ্কারা বিমানবন্দরে সিক্রেট সার্ভিস ও সামরিক বাহিনী অত্যন্ত গোপনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ক্যাটারিং ট্রাকের মাধ্যমে ট্রাম্পকে একটি সামরিক (সি-৩২এ) বিমানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে। স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৪৪ মিনিটের দিকে ট্রাম্পকে ছাড়া মূল এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানটি রানওয়ে ছেড়ে যায়, যার কয়েক মুহূর্ত পরেই ট্রাম্পের ছোট বিমানটি উড্ডয়ন করে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া

গত মঙ্গলবার পুরো ঘটনার কথা স্বীকার করলেও বিষয়টিকে বড় করে দেখতে রাজি হননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘সিক্রেট সার্ভিস ও নিরাপত্তা বাহিনী যেভাবে চেয়েছে, আমি শুধু তা-ই অনুসরণ করেছি। তারা আমাকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্য বিমানে যেতে বলেছিল, আমি তাদের কথা শুনেছি।’

অন্য বিমানে থাকা সহকর্মীদের ঝুঁকিতে ফেলা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ চতুরতার সঙ্গে বলেন, ‘সত্য বলছি, আমি কোনো কিছু নিয়ে পরোয়া করি না। যা-ই ঘটুক, তা নিয়ে আমার একটাই কথা—যা হওয়ার হবে।’ তিনি আরও দাবি করেন, তাঁর মনে হয়েছিল, ছোট বিমানটিতেই বরং ঝুঁকি বেশি ছিল।

২০২৪ সালের জুলাই ও নভেম্বরেও ট্রাম্পকে হত্যায় ইরানের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ উঠেছিল। তবে ইরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সম্প্রতি আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ইরান—এমন একটি প্রতিবেদন দেয় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা। তবে ইসরায়েলের দেওয়া এই গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা নিয়ে অনেক মার্কিন কর্মকর্তা সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতি ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেই হয়তো ইসরায়েল এই তথ্যের অবতারণা করেছিল।

তুরস্কের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়, তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য চুক্তি ও আলোচনা বানচাল করার উদ্দেশ্যেই ইসরায়েল এই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছিল।

অতীতে তুরস্কে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ছোটখাটো হামলার ইতিহাস থাকলেও এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বিমান ধ্বংস করার মতো জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালানো ইরানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, সেফ হাউস ও কঠোর চেকপোস্ট পার করে কাঁধে বহনযোগ্য মিসাইল আঙ্কারায় প্রবেশ করানো। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই ধরনের হামলা তুরস্ককে সরাসরি ইরানের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিত।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন, মিডল ইস্ট আই