ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা অর্জনে সচেষ্ট থাকা এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে ৬০ কোটি ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি অনুদান দেওয়া সিলিকন ভ্যালির ধনকুবেররা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের আর্থিক ও রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর (বিগ টেক) ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মধ্যে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই বড় ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাটরা।
অনুদানদাতাদের মধ্যে শীর্ষের ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক। তিনি একাই প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের বিভিন্ন নির্বাচনী লড়াইয়ে ৪৭ কোটি ডলার বা ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেন। এর ফলে নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানরা বিপুল অর্থ সংগ্রহের সুবিধা পেয়েছিল। এবারের নির্বাচন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল।
মাস্কের ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই খরচ হয়েছিল টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের পক্ষে। নানা কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত প্যাক্সটন মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর কাছে পরাজিত হন। প্যাক্সটনের মতোই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে সিনেটের আসনে লড়াই করা অন্য রিপাবলিকান প্রার্থীরাও পরাজিত হয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদের কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থীও হেরেছেন।
অলাভজনক সংস্থা টেক ওভারসাইট প্রজেক্টের প্রধান সাচা হাওয়ার্থ বলেন, ‘প্রযুক্তি নির্বাহীরা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করেছেন। কিন্তু তাঁদের এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কেবল কাগুজে বাঘের মতোই প্রমাণিত হয়েছে। আমেরিকানরা তাঁদের দুর্নীতিগ্রস্ত প্রভাব এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে কয়েক মাস ধরে বিগ টেকের নির্বাচনী ব্যয়ের সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা এক রাজনৈতিক কৌশলবিদ বলেন, ‘এই অর্থ কোনো কাজে আসেনি। ইলন মাস্ক অর্ধশত কোটি ডলার ব্যয় করেছেন, অথচ তিনি যেসব নির্বাচনী লড়াইয়ে অর্থ ঢেলেছেন, সেগুলোর প্রতিটিতেই হেরেছেন তাঁর সমর্থিত প্রার্থীরা।’
এনবিসির নির্বাচনী বুথফেরত জরিপ বা এক্সিট পোল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ ভোটার জানিয়েছেন, এআই ডেটা সেন্টার তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ কিংবা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তবে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেরদের বিপুল নির্বাচনী ব্যয়ের বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়েও অসন্তোষ কাজ করেছে।
ওই রাজনৈতিক কৌশলবিদের ভাষায়, এসব কারণ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটের ‘একচেটিয়া’ বা ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভোটের ঢেউ এতটাই প্রবল ছিল যে প্রযুক্তি খাতের নির্বাচনী ব্যয়কে পুরোপুরি ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।’
মাস্কের পাশাপাশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগকারী মার্ক অ্যান্ড্রিসেন ও বেন হোরোভিৎস মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৯ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেন। অন্যদিকে, ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ জেমিনির সহপ্রতিষ্ঠাতা ক্যামেরন ও টাইলার উইঙ্কলভস ব্যয় করেন ৫০ লাখ ডলারের বেশি।
ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যান এবং তাঁর স্ত্রী আনা মাগা ইনকরপোরেটেডকে (MAGA Inc) আড়াই কোটি ডলার এবং এআই-সমর্থক প্রধান রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি (পিএসি) লিডিং দ্য ফিউচারকে আরও আড়াই কোটি ডলার অনুদান দেন।
এআই ও ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধনকুবেররাও সিনেটে শেরড ব্রাউনের প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। ব্রাউন খাত দুটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সমালোচক হিসেবে পরিচিত। ক্রিপ্টোকারেন্সি-বান্ধব প্রার্থীদের সমর্থনে গঠিত সুপার পিএসি ফেয়ারশেক (Fairshake) ২০২৪ সালে অভিজ্ঞ এই সিনেটরকে পরাজিত করতে ভূমিকা রেখেছিল বলে কৃতিত্ব পেয়েছিল। এবারও ব্রাউনের বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপন প্রচারে সংস্থাটি ৫ কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করে।
অ্যান্ড্রিসেন ও হোরোভিৎস লিডিং দ্য ফিউচারকে ৫ কোটি ডলার অনুদান দেন। সংস্থাটি মূলত ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থনে অর্থ ব্যয় করে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলেইন গ্রাহামও এই পিএসির কাছ থেকে ২৫ লাখ ডলারের সমর্থন পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে পরাজিত হন তিনি। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেটের একটি আসন পায় ডেমোক্র্যাটরা।
প্রযুক্তি শিল্পের জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কয়েক ডজন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) পাস হয়েছে। এআই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের ভিত্তি হিসেবে কাজ করা এই অবকাঠামো নির্মাণের বিরোধিতা করে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ভোটাররা।
মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস বা প্রতিনিধি পরিষদের প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের জোটের নেতা গ্রেগ কাসারসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা ইতিমধ্যে আগামী বছর কংগ্রেসে নতুন ক্ষমতা ব্যবহার করে এআই কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদের শপথের অধীনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার দাবি জানাচ্ছেন।
তবে শেষ পর্যন্ত এসব নির্বাচনী প্রচারে ধনকুবেরদের ব্যয় তাঁদের মোট সম্পদের তুলনায় ছিল সামান্যই। ইলন মাস্কের ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের পরিমাণ এমন, যেন কোনো কোটিপতি মাত্র ৪০০ ডলার অনুদান দিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের তথাকথিত ‘ব্লু ওয়েভ’ বা নীল জোয়ারের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া তাঁর একটি পোস্ট মুছে ফেলেন। ওই পোস্টে তিনি ভোটারদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, ‘আজ লালকে (রিপাবলিকানদের) ভোট দিন!’