বাংলাদেশের শীর্ষ কূটনীতিক ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক বছরের সভাপতিত্বের মেয়াদে একটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। সেটি হলো, জাতিসংঘের ওপর সদস্য দেশগুলোর আস্থা পুনরুদ্ধার করা। জাতিসংঘের ১৯৪৫ সালের প্রতিষ্ঠার সময়কার আশাবাদ এবং এরপর সংস্থাটি সদস্য দেশগুলোর প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পেরেছে, সেই ব্যবধানের কথা তিনি প্রায়ই তুলে ধরেন।
জাতিসংঘের সবচেয়ে ব্যস্ত সপ্তাহ হিসেবে পরিচিত সপ্তাহটি শুরু হয়েছে। পৃথিবীর যেকোনো স্থানে একসঙ্গে বিশ্বনেতাদের সবচেয়ে বড় সমাবেশও এই সাধারণ পরিষদের অধিবেশন। এই সময় জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং বিশ্বের বিভিন্ন সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচিত হাই–লেভেল বা উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহটি শুরুর প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সংবাদমাধ্যম ইউএন নিউজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘে একটি ‘খুব প্রয়োজনীয় পরিবর্তন’ আসলে কেমন হতে পারে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কেন জাতিসংঘের সামনে এর আগে দেখা যায়নি এমন এক পরীক্ষা তৈরি করেছে এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি কী শিক্ষা নিয়ে এসেছেন।
সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের তুলনায় বাস্তবে ক্ষমতা কম প্রয়োগ এবং অচলাবস্থায় থাকা নিরাপত্তা পরিষদের তুলনায় এর সীমিত কার্যকারিতার মতো সমালোচনারও জবাব দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া চার দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশি এক সভাপতির অধীনে সাধারণ পরিষদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার পর কীভাবে তিনি নিজেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হওয়ার দায়িত্বে ফিরে এলেন, সেই বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি।
ড. খলিলুর রহমান: উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ জাতিসংঘের একত্র করার ক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ। এটি আমাদের সমাজগুলোকে যারা পরিচালনা করেন, তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি শোনার একটি সুযোগ। তাঁরা বিশ্বকে কীভাবে দেখেন, নিজেদের অঞ্চল ও দেশকে কীভাবে দেখেন এবং জাতিসংঘের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা কী—তা সরাসরি জানা যায়।
আমি গভীরভাবে দেখতে চাই, তাঁরা জাতিসংঘের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কী বলেন। এটিই আমার সভাপতিত্বের মূল বিষয়। আমি এটিকে আমার নিজের সভাপতিত্বের প্রধান লক্ষ্য করেছি এবং এই কর্মসূচিতে আমার কাজের দিকনির্দেশনা হিসেবে তাদের মতামতকে কাজে লাগাতে চাই।
ড. খলিলুর রহমান: বিষয়টি বুঝতে হলে ১৯৪৫ সালে এই সংস্থা প্রতিষ্ঠার সময়ের দিকে ফিরে যেতে হবে। সে বছর ইয়াল্টায় (মার্কিন) প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, (রুশ প্রেসিডেন্ট জোসেফ) স্তালিন ও (ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন) চার্চিল প্রায় ৮ দিন বৈঠক করেছিলেন। যুদ্ধ শেষ করার বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তারা এমন একটি বিশ্ব সংস্থার ধারণা করেছিলেন, যার প্রধান উদ্দেশ্য হবে দুই বিশ্বযুদ্ধে দেখা সংঘাতের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো।
সান ফ্রান্সিসকোতে যখন জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল দাঁড়িয়ে করতালি দিয়েছিল এবং বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়েই ছিল। এর মধ্য দিয়ে সেই আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ ঘটেছিল যে জাতিসংঘ শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে। আমি আনন্দের সঙ্গে বলতে পারি, এরপর কেটে যাওয়া আট দশকে আমরা বড় ধরনের বৈশ্বিক যুদ্ধ এড়াতে পেরেছি। সেই সময় আলোচনার টেবিলে যেসব দেশ ছিল না, তাদের অনেকেই ঔপনিবেশিক শাসন থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং জাতিসংঘের ভেতরে একটি শক্তিশালী উন্নয়ন স্তম্ভ গড়ে উঠেছে।
কিন্তু একই সময়ে আমরা অনেক সংঘাত ঠেকাতে পারিনি। উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অগ্রগতি অনেক সময় ধীর হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদ যাতে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করে এবং যেভাবে এটি কাজ করবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, সেভাবে ফল দিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। এই দুই স্তম্ভেই বড় ধরনের অপূর্ণ প্রত্যাশা রয়েছে। এর ফলে হতাশা তৈরি হয়। মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে জাতিসংঘ তার কাছ থেকে যে প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা পূরণ করতে পারছে না। আর এর ফলে জাতিসংঘের ওপর আস্থা কমেছে।
আমাদের তৃতীয় স্তম্ভ মানবাধিকার। এ ক্ষেত্রেও একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। জাতিসংঘের মোট ব্যয়ের মাত্র চার শতাংশ মানবাধিকারের পেছনে ব্যয় হয়। আমরা বড় ধরনের অগ্রগতি করেছি, কিন্তু এখনো অনেক কিছু করার বাকি রয়েছে। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময় যে আস্থা ছিল, তা ফিরিয়ে আনতে আমাদের তিনটি স্তম্ভেই কঠোরভাবে কাজ করতে হবে। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং এর জন্য সব সদস্য রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
ড. খলিলুর রহমান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। এটি মানুষের কর্মকাণ্ডকে অনেক দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার একটি বড় শক্তি হতে পারে। কিন্তু কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির করা ধ্বংসের পূর্বাভাস যদি সত্যি হয়, তাহলে এটি মানবতার জন্য গুরুতর বিপদও তৈরি করতে পারে। আমাদের কোনোভাবেই উদ্ভাবনের গতি কমানো উচিত নয়। উদ্ভাবন চলতেই হবে। তবে নিরাপত্তার সুরক্ষা ব্যবস্থা বা সীমারেখা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে এই উদ্ভাবন মানবতার কাজে আসে, মানবতার বিরুদ্ধে না যায়।
এটি শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়। প্রযুক্তি যারা তৈরি করছেন এবং যারা ব্যবহার করছেন, তাদের সবারই এতে ভূমিকা রয়েছে। সামনে যে আলোচনা ও সিদ্ধান্তগুলো হবে, সেখানে এই সব পক্ষকে যুক্ত করতে হবে। যাতে আমরা এমন একটি নিরাপদ পথ খুঁজে পাই, যার মাধ্যমে এআই সত্যিকার অর্থে মানবতার কাজে আসে।
ড. খলিলুর রহমান: সাধারণ পরিষদ যদি অকার্যকর হতো, তাহলে উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ হতো না এবং রাষ্ট্রপ্রধানরাও এখানে আসতেন না। নিশ্চয়ই এর কোনো না কোনো কার্যকারিতা আছে। আমি যেটি দেখতে পাই, তা হলো বিশ্বের প্রতিটি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা একটি সংস্থার অসাধারণভাবে মানুষকে একত্র করার ক্ষমতা। এর মতো আর কোনো জায়গা নেই।
কূটনীতি সব সময় প্রকাশ্যে হয় না। সাধারণ পরিষদ সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানদের গুরুতর বিষয় নিয়ে একসঙ্গে আলোচনা করার এবং সেগুলোর সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ দেয়। একই সঙ্গে এটি আমাদের সমাজগুলোকে যারা পরিচালনা করেন, তাদের কাছ থেকে সরাসরি শোনার একটি কর্তৃত্বপূর্ণ মাধ্যম। আমি বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাজের জন্য সাধারণ পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাবে। এটি নীতি ও আন্তর্জাতিক আচরণের মানদণ্ড নির্ধারণ এবং সামগ্রিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে।
ড. খলিলুর রহমান: এটি একটি ভয়াবহ মানবিক সংকট। একটি জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালানো হয়েছে, তাদের ঘরবাড়িতে বোমা হামলা হয়েছে, তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নিজেদের দেশের মানুষই তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। গর্ভবতী মায়েদের পেট কেটে তাদের গর্ভের সন্তানকে আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছে।
কিন্তু একই সঙ্গে আমি তাদের দৃঢ়তাও দেখেছি। তারা কীভাবে টিকে আছে, কীভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে এবং কীভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা ধরে রেখেছে, তা দেখেছি। গত বছর (জাতিসংঘের) মহাসচিব কক্সবাজার সফর করার সময় এক রমজানের সন্ধ্যায় লাখেরও বেশি শরণার্থী তাঁর সঙ্গে ইফতার করতে জড়ো হয়েছিল। প্রত্যেকের হাতে একটি করে প্ল্যাকার্ড ছিল। তাতে লেখা ছিল—‘আমরা বাড়ি ফিরতে চাই।’
আমি যে শিক্ষা সঙ্গে নিয়ে এসেছি, তা হলো, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান করবে না। এটি শুধু সমস্যাকে পিছিয়ে দেবে এবং আরও খারাপ করে তুলবে। শুধু আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে, একসঙ্গে বসার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এ কারণেই আমি সাধারণ পরিষদের এত গুরুত্ব দেখি। এটি এমন একটি জায়গা, যেখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষরা একটি নিরাপদ পরিবেশে একত্র হন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন।
খলিলুর রহমান: আজ আমি আমার দলকে এ কথাই বলেছি, আমি আজকের দিনের দিকে তাকাচ্ছি না। আমি সেই দিনের দিকে তাকাচ্ছি, যেদিন আমি আমার উত্তরসূরির হাতে সভাপতির হাতুড়ি তুলে দেব। যদি আমি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়ে একমত হতে সাহায্য করতে পারি, যদি সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে সচ্ছল রাখার বিষয়ে তাদের একমত করাতে পারি এবং যদি স্থানীয় পর্যায়ে কাজ বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে পারি, তাহলে এসব ক্ষেত্রের যেকোনো একটিতে যদি কিছু অগ্রগতি করতে পারি, আমি আনন্দের সঙ্গে আমার উত্তরসূরির হাতে সভাপতির হাতুড়ি তুলে দেব।