মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি নিয়ে একটি প্রস্তাবিত চুক্তি অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠিয়েছেন। তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক না করলে এই চুক্তি কার্যকর হবে না। মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা জানান, গত জুলাইয়ে চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। এর আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি রপ্তানি করতে পারবে। সোমবার চুক্তিটি কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা এসব তথ্য দেন।
এ বিষয়ে ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে কংগ্রেসে চুক্তিটি পাঠানোর মাধ্যমে ট্রাম্প কীভাবে তাঁর মূল লক্ষ্য এগিয়ে নিতে চান, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি। চুক্তিটি পর্যালোচনার জন্য কংগ্রেসের হাতে ৯০টি অধিবেশন দিবস রয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের ওই কর্মকর্তা ই-মেইলে বলেন, ‘সৌদি আরব আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ না দিলে চুক্তিটি এগিয়ে নেওয়া হবে না, এ বিষয়ে প্রেসিডেন্টের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।’
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং আরব ও মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি। ২০২০ ও ২০২১ সালে এসব চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছিল।
জুলাইয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তিতে সম্মত হওয়ার কয়েক দিন পরই ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাকে তিনি চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার শর্ত হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদেও সৌদি আরবের সঙ্গে একই ধরনের একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে কাজ করেছিলেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি করতে চেয়েছিলেন এবং সেটিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। ২০২৩ সালে কূটনীতিকদের ধারণা ছিল, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কিন্তু ওই বছরের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়।
সৌদি আরব এখনো ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে একটি অপরিবর্তনীয় পথ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
প্রস্তাবিত চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর। এর আওতায় সৌদি আরবে ‘এপি ১০০০’ ধরনের পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য মূল্য কয়েক হাজার কোটি ডলার। এই প্রকল্প থেকে বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে মার্কিন পারমাণবিক কোম্পানি ওয়েস্টিংহাউস। কোম্পানিটির যৌথ মালিকানায় রয়েছে কানাডাভিত্তিক ‘ক্যামেকো–Cameco’ এবং ‘ব্রুকফিল্ড অ্যাসেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট।’
মার্কিন কংগ্রেসের দুই সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিটি কংগ্রেসের নেতাদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং বুধবার এটি সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর কাছে পাঠানোর কথা রয়েছে। কংগ্রেস ৯০টি অধিবেশন দিবসের মধ্যে চুক্তিটির বিরুদ্ধে আপত্তি না জানালে এটি কার্যকর হয়ে যাবে। তবে কংগ্রেস যদি চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করে, ট্রাম্প সেই সিদ্ধান্তে ভেটো দিতে পারবেন। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে।
চুক্তিটি নিয়ে কিছু ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের পক্ষে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করেছেন। তাদের প্রধান আপত্তি হলো, চুক্তিতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অথবা ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে নিষিদ্ধ করার বিধান নেই। এই দুই প্রক্রিয়াই তাত্ত্বিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য পথ তৈরি করতে পারে।
২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি করার সময় সংযুক্ত আরব আমিরাত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। এই ধরনের বিধানকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সৌদি আরবের সঙ্গে করা চুক্তিতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
তবে ননপ্রলিফারেশন পলিসি এডুকেশন সেন্টারের প্রধান হেনরি সোকোলস্কি মনে করেন, চুক্তিটি কংগ্রেসে পাঠানোর মাধ্যমে ট্রাম্প এমন একটি সম্ভাবনাও তৈরি করেছেন, যেখানে কংগ্রেস ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার মতো শর্ত ছাড়াই চুক্তিটি অনুমোদন করতে পারে। সোকোলস্কির ভাষায়, “আপনি যদি সত্যিই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা এবং ইসরায়েলের স্বীকৃতি নিশ্চিত করার বিষয়ে আন্তরিক হন, তাহলে এটি মোটেও আদর্শ পরিস্থিতি নয়। ”