জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। নির্বাসিত তিব্বতিদের অধিকারকর্মী ও তাঁদের একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, তিনি একজন তিব্বতি ছিলেন এবং তিব্বতের স্বাধীনতার আহ্বান জানিয়ে নিজের গায়ে আগুন দেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের এক মুখপাত্র বলেন, স্থানীয় সময় গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে জরুরি ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ওই ব্যক্তিকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। পরে তাঁকে বেলভিউ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটির তদন্ত চলছে। তবে নিহত ব্যক্তির পরিচয় বা তাঁর এই পদক্ষেপের সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
নির্বাসিত তিব্বতিদের সংবাদমাধ্যম ভয়েস অব তিব্বত জানিয়েছে, তিব্বতি অধিকারকর্মী লোবগা রাংজেন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে তিব্বতের স্বাধীনতা ও তিব্বতিদের ঐক্যের পক্ষে সরাসরি আহ্বান জানানোর পর নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এএমনিউইয়র্ক জানিয়েছে, রাংজেন পেশায় উবারচালক ছিলেন। তিনি একটি তিব্বতি পতাকা নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। সংবাদমাধ্যমটি তাঁর সহকর্মী উবারচালক লোবসাং পালজোরের বক্তব্যও প্রকাশ করেছে। পালজোর জানান, তিব্বতি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সমাবেশের মাধ্যমে তিনি রাংজেনকে চিনতেন। পালজোরের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনা সরকার তিব্বতের মানুষের ওপর যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, তাতে রাংজেন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ছিলেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের নতুন জাতিগত ঐক্য আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। চলতি সপ্তাহে কার্যকর হওয়া এই আইন বেইজিংকে দেশের সীমানার বাইরেও অবস্থানরত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ভিত্তি দেয়। এই আইনের লক্ষ্য হলো দেশের ৫৫টি জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, যার মধ্যে তিব্বতি ও উইঘুররাও রয়েছে, তাদের মধ্যে একটি ‘অভিন্ন’ জাতীয় পরিচয় গড়ে তোলা। তবে এই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই চীনা শাসন নিয়ে অসন্তুষ্ট। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী তিব্বতিরা এই আইনের বিরোধিতা করে আসছেন।
এর আগেও তিব্বতি জনগোষ্ঠীর সদস্যরা তিব্বত এবং তিব্বতি অধ্যুষিত পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বেইজিংয়ের নীতির প্রতিবাদে আত্মাহুতির ঘটনা ঘটিয়েছেন। ১৯৫০ সালে চীন তিব্বতের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। বেইজিং এই ঘটনাকে সামন্ততান্ত্রিক দাসপ্রথা থেকে তিব্বতের ‘শান্তিপূর্ণ মুক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করে।
তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও নির্বাসিত তিব্বতিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, তিব্বতি এলাকায় চীনের শাসন দমনমূলক। যদিও চীন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। চীনে জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিচ্ছিন্নতাবাদের যেকোনো সম্ভাব্য ইঙ্গিতের অভিযোগে তিব্বতি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়। ২০১২ সালে সি চিন পিং দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে তিব্বতের ওপর বেইজিংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বতের সভাপতি তেনচো গিয়াতসো রাংজেনকে ‘তিব্বতের এক অক্লান্ত সমর্থক’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাংজেনের মৃত্যুতে তিনি ‘গভীরভাবে শোকাহত।’ সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৫০টির বেশি তিব্বতি আত্মাহুতির ঘটনা ঘটেছে। তাদের তথ্য বলছে, নির্বাসিত অবস্থায় থাকা তিব্বতিদের মধ্যে এ পর্যন্ত ১০টি আত্মাহুতির ঘটনা ঘটেছে।