মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্পের বিনিয়োগ থাকা একটি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানের কাছে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা করছে। চীনের ওপর ইসলামাবাদের নির্ভরতা কমানোর অংশ হিসেবে এই চুক্তি করার চেষ্টা চলছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, পাওয়ারাস (Powerus) নামের কোম্পানিটি গত বুধবার পাকিস্তানের ডি-ফ্যাক্টো নেতা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতারা।
তাদের ভাষ্য, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানে ড্রোনের উৎপাদন স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে ‘যৌথ উদ্যোগ’ গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হবে। এ ছাড়া পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছে ড্রোন ও ড্রোন প্রতিহত করার ইন্টারসেপ্টর প্রযুক্তি বিক্রির ব্যবস্থাও এতে রয়েছে বলে ইসলামাবাদে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
চুক্তিটির বাণিজ্যিক শর্ত প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কোম্পানিটি। তবে তারা জানিয়েছে, চুক্তির আওতায় প্রাথমিকভাবে ড্রোন-সংক্রান্ত প্রযুক্তি সরবরাহের একটি অর্ডার রয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
পাওয়ারাসের প্রেসিডেন্ট ও সহপ্রতিষ্ঠাতা ব্রেট ভেলিভিচ বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, বহু দশক ধরে মার্কিন সরকার পাকিস্তানের মতো দেশগুলোকে ড্রোন ব্যবস্থা দিতে অনাগ্রহী ছিল। অন্যদিকে চীন এখানকার মানুষ যা চেয়েছে, তা ব্যাপকভাবে সরবরাহ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এর ফলে এমন একটি নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছিল, যেখানে সম্ভবত তা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু এখন আমরা দেখছি, শুধু পাকিস্তান নয়, পাকিস্তানের বাইরেও মার্কিন নীতিতে এক ধরনের পরিবর্তন এসেছে এবং তারা তাদের আরও বেশি ড্রোন ব্যবস্থা অন্যদের দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছে।’
ভেলিভিচ যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সাবেক স্পেশাল ফোর্সেস গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালন করেছেন।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আমদানির পরিমাণের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে চীন থেকে। সিপ্রির তথ্য বলছে, বড় ধরনের অস্ত্রের ক্ষেত্রে পাকিস্তান বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ক্রেতা। কয়েক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক নেতা মুনির বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে নতুন করে জোরালো হয়ে ওঠা সম্পর্ককে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছেন তিনি।
এর পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের মতো বিভিন্ন খাতে চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করেছেন মুনির। পাওয়ারাসের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রু ফক্স বলেন, ‘পাকিস্তানের সামনে শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক সুযোগও রয়েছে। এখানে শিল্প গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের জন্য এটি একবারের কোনো চুক্তি নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সূচনা।’
গত বছর ‘অটোনোমাস পাওয়ার করপোরেশন’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাওয়ারাস। চলতি বছর নাসডাক-তালিকাভুক্ত গলফ কোর্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান অরিয়াস গ্রিনওয়ে হোল্ডিংসের সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। এই চুক্তির মধ্যস্থতা করেছে ডমিনারি সিকিউরিটিজ নামের একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্পও রয়েছেন।
ট্রাম্পের দুই ছেলেও ‘আমেরিকান ভেঞ্চার পার্টনার্স’ নামে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একীভূত কোম্পানিটিতে সরাসরি বিনিয়োগ করবেন।
পাওয়ারাস ইউক্রেন থেকে ড্রোন প্রযুক্তির লাইসেন্স নিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনে ব্যাপক হারে উৎপাদিত ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কোম্পানিটি আরও কয়েকটি ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেছে, যেগুলো কম খরচে এমন ড্রোন তৈরি করে যা যুদ্ধে, মানবিক জরুরি পরিস্থিতিতে এবং নির্ভুল কৃষিকাজে ভারী মালামাল বহন করতে পারে। কোম্পানিটি প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার ড্রোন ইন্টারসেপ্টরও তৈরি করে। প্রতিটি ইন্টারসেপ্টরের দাম ৫ হাজার ডলার। আগামী এক বছরে এই উৎপাদন পাঁচ গুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
গত মাসে মার্কিন বিমানবাহিনীকে ইন্টারসেপ্টর সরবরাহের জন্য ৯ কোটি ডলারের একটি চুক্তিও করেছে কোম্পানিটি।
পাওয়ারাসের আঞ্চলিক কার্যক্রমও বাড়ছে। জুলাই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইন্টারসেপ্টর উৎপাদন শুরু করে কোম্পানিটি। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে দেশটি। অন্যদিকে, পাকিস্তানও তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে আগ্রহী। গত বছর ভারতের সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তীব্র সংঘাতের পর এই আগ্রহ আরও বেড়েছে। ওই সংঘাতে ভারতীয় বাহিনী লাহোর ও রাওয়ালপিন্ডির মতো শহরের গভীরে সশস্ত্র ড্রোন পাঠিয়েছিল।
পাকিস্তানি ও মার্কিন কর্মকর্তারা দুই দেশের সম্পর্কের একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে আগ্রহী। তবে উভয় পক্ষের কর্মকর্তারাই ব্যক্তিগতভাবে স্বীকার করেন, বর্তমানে এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি হলো ট্রাম্প ও মুনিরের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট মুনিরকে ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নানা কারণে জটিল হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তানে তালেবানের প্রতি ইসলামাবাদের অতীত সমর্থন, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানে খুঁজে পাওয়ার ঘটনা এবং পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টা।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাকিস্তান ট্রাম্প-সমর্থিত ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগ ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক উইটকফ। তিনি মার্কিন বিশেষ দূত এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফের ছেলে।