নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি জয়ী হলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিককে ৫ হাজার ডলার দেওয়ার এক অভাবনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বুধবার রাতে টেক্সাসে দলীয় কনভেনশনে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় তাঁর সমর্থকেরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও ডেমোক্র্যাটরা একে একটি ‘ফাঁকা বুলি’ বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে আইনি ও আর্থিক দিক থেকে এই বিশাল প্রতিশ্রুতি পূরণ সম্ভব কি না, তা নিয়ে বিতর্ক ও সংশয় তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন অনুযায়ী, ভোটারদের ভোটকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে প্রত্যক্ষ অর্থ প্রদান করা সম্পূর্ণ বেআইনি বা ঘুষ হিসেবে গণ্য হয়। তবে এটি আদৌ বেআইনি কি না, তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক ড. জোয়ান মাহোনি বিবিসিকে বলেন, এই প্রস্তাবটিকে কর ছাড়ের প্রতিশ্রুতির মতো একটি সাধারণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখা যেতে পারে। যেহেতু এটি নির্বাচনে কাকে ভোট দেওয়া হয়েছে তা বিবেচনা না করে সবাইকে সমানভাবে দেওয়া হবে, তাই এটিকে সরাসরি ‘ঘুষ’ হিসেবে গণ্য করা কঠিন।
অন্যদিকে চ্যাথাম হাউসের মার্কিন ও উত্তর আমেরিকা প্রোগ্রামের পরিচালক লরেল র্যাপ মনে করেন, সাধারণ প্রার্থীর কর কমানোর প্রতিশ্রুতির চেয়ে ট্রাম্পের এই অফারটি অনেক বেশি সরাসরি এবং ‘লেনদেনমূলক চুক্তি’।
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি। ফলে সবাইকে ৫,০০০ ডলার করে দিতে গেলে মার্কিন সরকারের মোট খরচ হবে প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার।
ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে এই বিপুল অর্থের উৎস নিয়ে কোনো স্পষ্ট বিবরণ দেননি। তবে তাঁর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দেওয়া কতটা কঠিন, তা তুলে ধরেছেন অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারের যেকোনো ব্যয় অনুমোদনের এখতিয়ার একমাত্র মার্কিন কংগ্রেসের। কোনো নির্বাহী আদেশ দিয়ে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো বিশাল পরিমাণ অর্থ ছাড় করা প্রেসিডেন্টের পক্ষে আইনিভাবে প্রায় অসম্ভব। ওয়াশিংটনভিত্তিক ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এরিকা ইয়র্ক জানান, কংগ্রেস এই ধরনের কোনো বাজেট প্রস্তাব অনুমোদন করবে বলে তিনি মনে করেন না।
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বসানো শুল্ক (ট্যারিফ) থেকে অর্জিত রাজস্ব দিয়ে এই অর্থ শোধ করা হতে পারে। কিন্তু বাইপার্টিসান পলিসি সেন্টারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ও আবগারি কর থেকে মোট আয় করেছে প্রায় ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার, যা দাবিকৃত অর্থের এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম। তদুপরি, বছরের শুরুতে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে বেশ কিছু শুল্ক বাতিল হওয়ায় ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ফেরত দিতে হয়েছে।
ভ্যান্স আরও জানান, এই টাকা ধনী নাগরিকদের দেওয়া হবে না এবং তা অবশ্যই যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে খরচ করতে হবে। তবে এর তদারকি কীভাবে হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রিপাবলিকান দলের সাবেক পরামর্শক রবার্ট মোরানের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের কম সময় বাকি। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে রিপাবলিকান পার্টি এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা দেখা যাওয়ায় ভোটারদের আকর্ষণ করতেই তিনি এই কৌশল বেছে নিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এর আগেও ট্রাম্প শুল্কের রাজস্ব থেকে ২,০০০ ডলার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জো বাইডেনও জর্জিয়ার সিনেট নির্বাচনে জয়ের জন্য ২,০০০ ডলারের কোভিড উদ্দীপনা চেক দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউস অবশ্য সমালোচনার জবাবে বলেছে, ‘যাঁরা বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছে, তাঁরা সব সময়ই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবমূল্যায়ন করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনগণের সমর্থন নিয়ে তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন।’