মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পঞ্চম সপ্তাহে পড়ছে। ঠিক এই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং তেহরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগদ্বীপ দখল করতে পারে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন কমান্ডার-ইন-চীফ বলেন, তাঁর ‘পছন্দ হলো তেল দখল করা।’
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই সামরিক আগ্রাসনকে এ বছরের শুরুর দিকে ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানের সঙ্গে তুলনা করেন। সেই অভিযানে লাতিন আমেরিকার দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে ধরে আনার পর ওয়াশিংটন দেশটির তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।
ট্রাম্প ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমার সবচাইতে প্রিয় কাজ হলো ইরানের তেল দখল করা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কিছু নির্বোধ লোক আছে যারা প্রশ্ন তোলে, কেন আপনি এটা করছেন? তারা আসলে নির্বোধ।’
তিনি ইঙ্গিত দেন যে, এই পদক্ষেপের অর্থ হতে পারে খারগদ্বীপ দখল করা। তিনি বলেন, ‘হয়তো আমরা খারগ দ্বীপ দখল করব, আবার হয়তো করব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে... তবে এর অর্থ হলো আমাদের বেশ কিছু সময় সেখানে (খারগদ্বীপে) অবস্থান করতে হবে।’
মার্কিন নেতার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে এবং অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী করেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পেন্টাগন ইরানে প্রায় ১০ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে কয়েক সপ্তাহের সম্ভাব্য স্থল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত সপ্তাহে ২ হাজার ২০০ মেরিনসহ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কর্মী সেখানে পৌঁছেছে এবং ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজার হাজার সেনার পাশাপাশি আরও ২ হাজার ২০০ মেরিন সেখানে যাওয়ার পথে রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের রপ্তানি কেন্দ্রে যেকোনো স্থল অভিযান মার্কিন সেনাদের চরম বিপদে ফেলতে পারে এবং যুদ্ধকে সংক্ষিপ্ত করার বদলে দীর্ঘায়িত করতে পারে। খারগ দ্বীপটি ইরানি উপকূল থেকে ১৬ মাইল (২৬ কিমি) দূরে উপসাগরের উত্তর প্রান্তে এবং হরমুজ প্রণালী থেকে প্রায় ৩০০ মাইল (৪৮৩ কিমি) উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। ইরানের তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের মাধ্যমে হয়। এটি দখল করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি বাণিজ্যে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারবে, যা তেহরানের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, তেহরান জাহাজ চলাচলের পথ লক্ষ্য করে মাইন (বিশেষ করে উপকূল থেকে ভাসমান মাইন) মোতায়েন করতে পারে। এতে ওই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, যা ইতিমধ্যে এই সংঘাতের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আমি মনে করি না তাদের কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আছে। আমরা খুব সহজেই এটি দখল করতে পারি।’
তিনি আরও দাবি করেন, পাকিস্তানের ‘দূতদের’ মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে এবং এতে ইতিবাচক অগ্রগতি হচ্ছে। তবে আগামী দিনগুলোতে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে কি না, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি। ট্রাম্প তেহরানকে সংঘাত অবসানের শর্তাবলীতে রাজি হওয়ার জন্য ৬ এপ্রিল পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন; অন্যথায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে মার্কিন হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের আরও প্রায় ৩ হাজার লক্ষ্যবস্তু বাকি আছে, আমরা ইতিমধ্যে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বোমা মেরেছি এবং আরও কয়েক হাজার লক্ষ্যবস্তু বাকি আছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘একটি চুক্তি বেশ দ্রুতই হতে পারে।’
ট্রাম্প ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে আরও বলেন, ওয়াশিংটনের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে তেহরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে আরও বেশি পাকিস্তানি পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। মার্কিন নেতার মতে, এই সংখ্যা ১০ থেকে বেড়ে ২০-এ দাঁড়িয়েছে, যদিও স্বাধীনভাবে এই তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।