বোর্ড অব পিসের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনে বোর্ড অব পিসের উদ্বোধনী বৈঠকের আয়োজন করবেন। একই সঙ্গে সদস্যদেশগুলোর প্রতিনিধিদের একত্র করে তিনি গাজার পুনর্গঠনের কৌশল ও অর্থায়ন ঘোষণা করবেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা সতর্ক দূরত্ব বজায় রাখলেও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এই প্রথম বৈঠকে যোগ দিচ্ছে। বৈঠকটি ওয়াশিংটনের ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসে অনুষ্ঠিত হবে। বোর্ডের ‘অসীম সম্ভাবনা’র প্রশংসা করে এর অনির্দিষ্টকালীন চেয়ারম্যান ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘বোর্ড অব পিস ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে প্রমাণিত হবে।’
সমালোচকেরা এই বোর্ডকে ট্রাম্পের ‘সাম্রাজ্যবাদী অ্যাজেন্ডা’র অংশ বলে আখ্যা দিয়েছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এর সম্প্রসারিত সনদ জাতিসংঘের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো। এ ছাড়া ট্রাম্প ইসরায়েলের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিনকে বোর্ডে আসন দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ায়ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে এই দুই নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এখন পর্যন্ত কেবল নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন। যদিও গাজা এক্সিকিউটিভ বোর্ডে তুরস্ক ও কাতারের কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বোর্ড অব পিসের বৃহস্পতিবারের বৈঠকে অংশ নিতে যাওয়া কয়েকজন প্রতিনিধির জন্য বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাদের নিজ নিজ দেশে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনা। ইসরায়েলের চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধের কারণে গাজার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সমর্থন ও অস্ত্র সহায়তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আশা করছে, সদস্যদেশগুলো গাজার মানবিক ও পুনর্গঠন কার্যক্রমে ৫০০ কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেবে। বোর্ডে তথাকথিত একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের গত বছর ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনা অনুযায়ী এই বাহিনী গাজায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে।
পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পরিচালনার জন্য টেকনোক্র্যাটিক প্রশাসন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। গত মাসে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সাইডলাইনে আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড অব পিস উন্মোচন করা হয়। ট্রাম্পের জামাতা ও নির্বাহী সদস্য জ্যারেড কুশনার সেখানে গাজার জন্য চকচকে পুনর্গঠন পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। এতে সমুদ্রতীরবর্তী রিসোর্ট ও উঁচু অট্টালিকার প্রস্তাব ছিল। ফিলিস্তিনি অধিকার সংগঠনগুলো এটিকে ‘সাম্রাজ্যবাদী’ বলে সমালোচনা করেছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, বোর্ডের সদস্যদেশগুলো গাজাবাসীর নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী ও স্থানীয় পুলিশে হাজারো সদস্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইসরায়েলের গাজায় বোমাবর্ষণ এবং পশ্চিম তীরে অভিযান ও ভাঙচুরে বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুনর্গঠন নিজেই একটি বিশাল কাজ। জাতিসংঘের হিসাবে এর ব্যয় হতে পারে প্রায় ৭ হাজার কোটি ডলার। শুরুতে বোর্ডটিকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ মধ্যস্থতার একটি সংস্থা হিসেবে কল্পনা করা হলেও পরে এর সনদ সম্প্রসারিত করা হয়। এখন বিশ্বজুড়ে সংঘাত সমাধানের লক্ষ্যও এতে যুক্ত হয়েছে। ট্রাম্প তার পোস্টে লিখেছেন, বোর্ড গাজার বেসামরিক জনগণের জন্য একটি সাহসী ভিশন উপস্থাপন করবে এবং শেষ পর্যন্ত গাজার বাইরে গিয়ে বিশ্বশান্তির পথে কাজ করবে।
ওয়াশিংটনে কে আসছে, কে আসছে না?
হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে ৫০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ জন নেতা আগ্রহ দেখিয়েছেন। এখন পর্যন্ত ২৬টি দেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে। অন্তত ১৪টি দেশ আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইউরোপ
ট্রাম্পের বোর্ড অব পিস ও এর বিস্তৃত সনদ নিয়ে ইউরোপ বিভক্ত। ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্সি শেষ হওয়ার পরও চেয়ারম্যান থাকতে চান। ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, তারা বোর্ডে যোগ দেওয়ার কথা ভাবছে না। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়ন বৃহস্পতিবারের বৈঠকের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালে পুতিনকে বোর্ডে আমন্ত্রণ দেওয়ায় ইউরোপের জন্য বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। পুতিন এখনো সদস্য হবেন কি না, তা জানাননি। ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের মতো প্রধান ইউরোপীয় শক্তিগুলো সদস্য হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ইইউ সদস্য না হলেও পর্যবেক্ষক হিসেবে তাদের ভূমধ্যসাগরবিষয়ক কমিশনার দুব্রাভকা সুইচা বৈঠকে অংশ নেবেন। এক মুখপাত্র বলেছেন, সনদ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গাজার শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে ইইউ।
ইইউ যোগ না দিলেও এর সদস্যদেশ হাঙ্গেরি ও বুলগেরিয়া বোর্ড অব পিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান বৈঠকে অংশ নেবেন। তিনি ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র। কসোভো ও আলবেনিয়াও সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে। ইতালি, সাইপ্রাস, গ্রিস ও রোমানিয়া পর্যবেক্ষক হিসেবে প্রতিনিধি পাঠাবে। রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকুসর দান নিজে উপস্থিত থাকবেন। পোপ লিও, যিনি বিশ্বে প্রায় ১৪০ কোটি ক্যাথলিকের নেতা, বোর্ডে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, সংকট পরিস্থিতি জাতিসংঘের মাধ্যমেই মোকাবিলা করা উচিত।
ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির ভিজিটিং ফেলো তাহানি মুস্তাফা আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্ররা নিয়মভিত্তিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় থাকতে চায়। এতে তারা সমান অবস্থান পায়। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ বেশি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি বড় শক্তি বোর্ড অব পিসে যোগ দিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বৈঠকে অংশ নেবেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরক্কো ও বাহরাইন প্রথম দিকেই যোগ দেয়। পরে মিসর যুক্ত হয়। এরপর সৌদি আরব, তুরস্ক, জর্ডান ও কাতার যোগ দেয়। তারা জানায়, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের পক্ষে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পরে কুয়েতও যোগ দেয়। এসব দেশই প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে।
মুস্তাফা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাস্তববাদী হওয়ার চেষ্টা করছে। তারা মনে করে, গাজার জন্য যা ভালো এবং রক্তপাত বন্ধ করতে যা দরকার, সেটাই করা উচিত। তিনি আরও বলেন, আসলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক শক্ত করতে চায় এবং ট্রাম্পকে অসন্তুষ্ট করতে চায় না। পাশাপাশি তিনি মন্তব্য করেন, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক মধ্যপ্রাচ্যের দেশের রেকর্ড ভালো নয়।
এশিয়া-ওশেনিয়া
মধ্য এশিয়া থেকে কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমারত তোকায়েভ এবং উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ সদস্য হিসেবে বৈঠকে যোগ দেবেন। আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এবং আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভও সদস্য হিসেবে ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবো সুবিয়ান্তো বৈঠকে রয়েছেন। ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক তো লামও সদস্যদের বৈঠকে যোগ দেবেন।
দক্ষিণ এশিয়া থেকে কেবল পাকিস্তান বোর্ডে যোগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ওয়াশিংটনে যাচ্ছেন। ভারত জানিয়েছে, তারা আমন্ত্রণ পর্যালোচনা করছে। এখনো যোগ দেয়নি এবং পর্যবেক্ষকও পাঠাচ্ছে না। নিউজিল্যান্ড আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আরও স্পষ্টতা চায়। অস্ট্রেলিয়া এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
কারা নিজ দেশে চাপের মুখে?
২০ জনের বেশি নেতা ওয়াশিংটনে জড়ো হচ্ছেন। গাজায় পুলিশিং ও প্রশাসন নিয়ে সিদ্ধান্ত তাদের নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইন্দোনেশিয়ায় স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে সমর্থন বহু দশকের পুরোনো। ১৯৪৫ সালে নিজেদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ও তারা ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সমর্থন পেয়েছিল। ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবো সুবিয়ান্তো বোর্ডে যোগ দেওয়ার পর দেশটিতে মতভেদ দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনের বৈঠকের ফল তার জন্য দেশে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও দেশে চাপের মুখে পড়তে পারেন। পাকিস্তানের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।