হোম > বিশ্ব > পাকিস্তান

মুখোমুখি ইমরান–সরকার: পিটিআইয়ের একমাত্র প্রাদেশিক সরকার ভেঙে জরুরি অবস্থা জারির পাঁয়তারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইসলামাবাদ অভিমুখে ইমরান খানের সমর্থকদের মিছিল। ছবি: এএফপি

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় (কেপি) পিটিআই নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারকে ঘিরে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রদেশটির মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। চলমান তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে কেপি সরকার সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ তুলে প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি বিবেচনা করছে ইসলামাবাদ। একই সময়ে পিটিআইয়ের ইসলামাবাদমুখী লং মার্চ এবং কেন্দ্রের সঙ্গে দলটির আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় রাজনৈতিক পরিস্থিতিও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

গতকাল সোমবার পার্লামেন্টারি অ্যাফেয়ার্সমন্ত্রী তারিক ফজল চৌধুরী পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজকে বলেন, কেপি সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ থেকে সরে থাকা জাতীয় পর্যায়ের সন্ত্রাসবিরোধী প্রচেষ্টায় গুরুতর ক্ষতি করছে। তার অভিযোগ, প্রাদেশিক সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশেও দাঁড়াচ্ছে না এবং মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করছেন না। চৌধুরী বলেন, আফগানিস্তান নিয়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি দেশের তিনটি প্রদেশ অনুসরণ করলেও কেপি তা করছে না।

এই পরিস্থিতিতে কেপিতে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টি কেন্দ্রীয় সরকার বিবেচনা করছে বলে জানান তিনি। তবে জরুরি অবস্থা জারির প্রক্রিয়া, সময়সীমা বা এর মাধ্যমে বর্তমান প্রাদেশিক সরকারকে সরানোর বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

কেপি সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের অভিযোগ নতুন নয়। কয়েক দিন আগে তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার পিটিআইকে প্রকাশ্যে অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে প্রশ্ন তোলেন, প্রদেশজুড়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলার মধ্যে দলটি পাকিস্তানের পাশে আছে, নাকি আফগানিস্তানের পাশে।

গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে তারার বলেন, পিটিআই নেতৃত্বাধীন কেপি সরকার সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানগুলোর দায় নিতে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। তিনি পিটিআইকে তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) ‘বি-টিম’ বলেও অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, গত ১২ বছর ধরে পিটিআই সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করেছে। এটি ছিল তার রাজনৈতিক অভিযোগ, যার পক্ষে তিনি প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, কেন্দ্র ও কেপির মধ্যকার বিরোধকে শুধু রাজনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, এটি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গেও সম্পর্কিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, গত দুই বছরে কেপিতে প্রায় ৬ হাজার ২০০টি সন্ত্রাসী ঘটনা, ১ হাজার ২০০ জনের মৃত্যু এবং ৩৭টি আত্মঘাতী হামলা ঘটেছে এবং এসব ঘটনায় আফগান নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

আসিফ আরও বলেন, শুধু চলতি বছরেই ১৪টি আত্মঘাতী হামলা হয়েছে, যার বেশির ভাগের সঙ্গে আফগান নাগরিকরা জড়িত। তাঁর দাবি, অর্থের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু কেপিতে দুর্নীতি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থা থাকায় সেই অর্থের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে।

আলোচনা ব্যর্থ, লং মার্চও চলছে

কেপি সরকারকে ঘিরে কেন্দ্রের কঠোর অবস্থানের সঙ্গে পিটিআই ও সরকারের রাজনৈতিক সংঘাতও একই সময়ে তীব্র হয়েছে। পিটিআইয়ের ৪ অক্টোবরের ইসলামাবাদমুখী লং মার্চ ঠেকাতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত চলা সেই আলোচনা কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। দুই পক্ষই একে অপরকে আলোচনা নস্যাৎ করার জন্য দায়ী করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি অভিযোগ করেন, কেপির মুখ্যমন্ত্রী পিটিআই ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার আলোচনা ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তবে পিটিআইয়ের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজা বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের একটি দাবি। তাঁর বক্তব্য, কেপিতে কেন্দ্রীয় সরকার একতরফাভাবে যেসব সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলোর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় কেপি সরকারকে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছিল।

গত রোববার এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে রাজা বলেন, পিটিআই তাদের নীতিগত অবস্থানে অটল ছিল। তাদের অবস্থান ছিল, কেপিতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে এবং কেপি বিধানসভায় প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পরামর্শ ও তাদের সম্মতির ভিত্তিতে এসব পদক্ষেপের কাঠামো তৈরি করতে হবে।

এর মধ্যেই পিটিআই ৪ অক্টোবরের লং মার্চ নিয়ে এগিয়ে যায়।

‘লং মার্চ ইসলামাবাদে ঢুকতে দেওয়া হবে না’

তারিক ফজল চৌধুরী বলেন, বিরোধীদের অগ্রাধিকার হচ্ছে রাজনীতি এবং পিটিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান। তিনি ইমরান খানকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করলেও তার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই বলে জানান। তিনি বলেন, অতীতেও ইমরান খানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের দরজা সবসময় খোলা থাকে। তবে নিকট ভবিষ্যতে আবার আলোচনা শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন না।

মন্ত্রী জানান, সরকার ও বিরোধীদের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার দুটি প্রধান কারণ ছিল। প্রথমত, বিরোধী দলের আলোচনাকারী প্রতিনিধিদলের পর্যাপ্ত ক্ষমতা ছিল না। তাঁর ভাষায়, ‘সব ক্ষমতা ছিল কেপি সরকারের হাতে।’ আলোচনায় থাকা প্রতিনিধিরাও সরকারকে জানিয়েছিলেন, দাবিগুলো পূরণ করার ক্ষমতা তাদের নেই। দ্বিতীয় কারণ ছিল দুই পক্ষের অগ্রাধিকারের মধ্যে পার্থক্য। চৌধুরী একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই পিটিআইয়ের লং মার্চকে ইসলামাবাদে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

পিটিআই: কেপি সরকার ছাড়বে না

কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেও পিটিআই কেপির সরকার ধরে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। পিটিআই চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গহার আলী খান সোয়াতে বলেন, দলের লং মার্চ স্থগিত হয়নি এবং তা চলবে। তিনি বলেন, এমন কোনো সমস্যা নেই যার সমাধান সম্ভব নয় এবং পিটিআইয়ের দাবিও খুবই সরল।

তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি খুবই সহজ। ইমরান খানের সঙ্গে একটি বৈঠকের ব্যবস্থা করতে হবে।’ গহার আলী খান আরও বলেন, পিটিআই কেপি সরকার ছেড়ে যাবে না এবং প্রাদেশিক পরিষদও ভেঙে দেবে না। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে কেপির বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দাবি করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে গভর্নরের শাসন জারি না হলেও প্রদেশটিতে এরই মধ্যে ‘গভর্নরের শাসন’ কার্যকর রয়েছে।

ফলে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান নিয়ে কেন্দ্র ও কেপি সরকারের বিরোধ এখন সরাসরি প্রাদেশিক সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। একদিকে ইসলামাবাদ জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনা বিবেচনা করছে বলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জানিয়েছেন, অন্যদিকে পিটিআই বলছে তারা কেপি সরকার বা প্রাদেশিক পরিষদ কোনোটিই ছাড়বে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসলামাবাদমুখী লং মার্চ এবং ভেঙে যাওয়া রাজনৈতিক সংলাপ, ফলে পাকিস্তানের কেন্দ্র ও কেপির সম্পর্ক নতুন করে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে।