হোম > বিশ্ব > পাকিস্তান

মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে নতুন সদস্য নেওয়ার পথ খোলা—বাংলাদেশের আগ্রহ প্রসঙ্গে পাকিস্তান

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে নতুন কোনো দেশ যোগ দিতে চাইলে জোটের অন্য অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (২) শামা ওবায়েদের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জের ধরে জানতে চান, বাংলাদেশ মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে কি না এবং এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান কোনো কূটনৈতিক বা কৌশলগত ভূমিকা রাখছে কি না। পাশাপাশি ইরান ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোর আগ্রহ নিয়েও বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়।

জবাবে পাকিস্তানি মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মূলত আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা একটি প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো। একটি উদীয়মান নিরাপত্তা বলয় হিসেবে যেসব দেশ যৌথ দায়বদ্ধতা এবং অভিন্ন নিরাপত্তা স্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ, তাদের জন্য এই জোটের দরজা সব সময়ই খোলা রয়েছে।

নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির মেকানিজম ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জোটে যোগদানের জন্য যেকোনো দেশ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা অনুরোধ পাওয়া গেলে আমাদের মূল দুই অংশীদার রিয়াদ ও আঙ্কারার (সৌদি আরব ও তুরস্ক) সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও ত্রিপক্ষীয় পরামর্শের মাধ্যমে তা বিবেচনা করা হবে।

তবে ব্রিফিংকালে পাকিস্তানি মুখপাত্র সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ, সিরিয়া বা ইরানের নাম নির্দিষ্ট করে উচ্চারণ করা থেকে বিরত থাকেন। তিনি জানান, যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কাঠামোটি বাস্তবে কার্যকর করার প্রক্রিয়াটি এখনো একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে যোগদানের বিষয়টি বাংলাদেশ সরকার বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (২) শামা ওবায়েদ ইসলাম।

সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দিলে তা দেশের স্বার্থ, অর্থনীতি ও জনগণের জন্য কতটা লাভজনক হবে, সেটি আগে মূল্যায়ন করা হবে। পরে বিষয়টি নিয়ে দেশের একটি ইংরেজি দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিএনপির মিডিয়া সেলও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা নিশ্চিত করে।

সাক্ষাৎকারে শামা ওবায়েদ বলেন, বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে বড় বড় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব রাজনীতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, প্রায় প্রতিটি দেশই কোনো না কোনো বৃহত্তর জোটে যোগ দিচ্ছে। যেমন সার্ক, বিমসটেক, ইন্দো-প্যাসিফিক, কোয়াড ও ব্রিকস—বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের জোট রয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, যুদ্ধ-পরবর্তী আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক এই প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে। এর মূল ভিত্তি হলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষা। তিনি বলেন, ‘মক্কা প্যাক্ট মূলত আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের ভাবনা থেকে এসেছে। এই প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রথম শর্তই হলো—যদি একটি সদস্যদেশ আক্রান্ত হয়, তাহলে সেটিকে তিনটি দেশই আক্রান্ত হয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে। এটি শুধু সামরিক সহযোগিতার চুক্তি নয়, সদস্যদেশগুলোর অর্থনীতি ও জনগণের নিরাপত্তার লক্ষ্যেও এটি তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগ্রহী অন্য যে কোনো দেশের এতে যোগদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।’

বাংলাদেশ কী যোগ দেবে

সাক্ষাৎকারে সরাসরি এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সরকার বিষয়টি নিয়ে ভাবছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য সব ধরনের লাভ-ক্ষতির মূল্যায়ন করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যোগ দেবে কি না—এর উত্তরে বলব, বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে প্রথমেই দেখতে হবে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দিক থেকে এই চুক্তিতে যোগ দিলে আমাদের লাভ কতটা হবে।’

প্রতিমন্ত্রীর মতে, সম্ভাব্য লাভের মধ্যে অর্থনৈতিক সুবিধা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হবে। তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য ভালো। আমাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। আপনারা জানেন, তুরস্কের সঙ্গে আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সম্প্রতি তুরস্ক থেকে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করেছে। একইভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেখানে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।’

Weekly Press Briefing by the Spokesperson @TahirAndrabi

On Other Countries Joining Makkah Joint Defence Agreement pic.twitter.com/MZ5KMxFipT

— Ministry of Foreign Affairs - Pakistan (@ForeignOfficePk) August 27, 2026
An error occurred while retrieving the Tweet. It might have been deleted.

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কগুলো অবশ্যই বিবেচনায় থাকবে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে বাংলাদেশ এই চুক্তি থেকে বাস্তবে কী অর্জন করতে পারে তার ওপর। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই বাংলাদেশ বিষয়টি বিবেচনা করবে। কিন্তু আবারও বলছি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আমরা এই চুক্তি থেকে কতটা লাভবান হব তার ওপর। যদি আমরা মনে করি আমাদের লাভ বেশি, দেশের মানুষের উপকার হবে, তাহলে অবশ্যই সরকার সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে।’

এদিকে সংসদে মক্কা প্যাক্টে যোগদানের বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘তারা যদি বাংলাদেশকে এ প্যাক্টে নেওয়ার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করে, তাহলে আমরা নিশ্চয় এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।’

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে আজ বিকেলে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়।

রুমিন ফারহানা সম্পূরক প্রশ্নপর্বে প্রশ্ন রাখেন, ‘সৌদি আরব-তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে গত ৭ আগস্ট মক্কা প্যাক্ট করেছে, সেখানে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সুবিধাটা কী হবে? বাংলাদেশ কি যুক্ত হবে?’

জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘এ প্যাক্ট তিনটি দেশের মধ্যে হয়েছে। প্যাক্টটিকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। এতে যোগদান বা যোগদান না করার বিষয়টি এখনো আসেনি, কারণ এটা নির্ভর করছে প্যাক্টের সদস্যদের অভিপ্রায়ের ওপর। তারা যদি বাংলাদেশকে এ প্যাক্টে নেওয়ার বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশ করে তাহলে আমরা নিশ্চয় এটাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করব।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এর ভালোমন্দ নিয়ে আলোচনা করা, সম্ভবত সে সময় আসেনি। আমরা নিশ্চয়ই সব বিষয় বিবেচনা করব। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে একটা কথা, এ প্যাক্ট যদি বিস্তৃত হয়, এটা হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। এটা আমাদের পরিবার। এটা মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তা নিয়ে কারও, অন্যান্যদের উদ্বেগের প্রয়োজন নেই।’