১৯ বছর পর পাকিস্তানের লাহোরে আবার ফিরেছে ঐতিহ্যবাহী ঘুড়ি উৎসব ‘বাসন্ত’। দীর্ঘ বিরতির পর শহরের আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ির ওড়াউড়ি, ছাদে ছাদে মানুষের হাসি–চিৎকার আর ঢোলের শব্দ যেন বসন্তের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। তবে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রাণহানির তিক্ত স্মৃতিও। মূলত এই কারণেই ২০০৭ সালে উৎসবটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
উৎসবকে সামনে রেখে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) বিবিসি জানিয়েছে, লাহোরের পুরোনো শহরের সরু গলিতে হেঁটে চোখে পড়েছে বৈদ্যুতিক তারে আটকে থাকা ঘুড়ি নামানোর চেষ্টা করছেন যুবক ও কিশোরেরা, মাথার ওপর হঠাৎ রঙিন কাগজের ঝলক, দূরে কোথাও ঢোলের আওয়াজ। অসংখ্য ঘুড়ি কখনো জিগজ্যাগ, আবার কখনো গোল পাকিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে।
লাহোরের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী টেক ইঞ্জিনিয়ার আবু বকর আহমেদ মত দিলেন, ঘুড়ি ওড়ানো মোটেও সহজ নয়। তাঁর চাচাতো ভাই তাঁকে ঘুড়ির সুতা টানার কৌশল শেখাচ্ছিলেন। হাসতে হাসতে আবু বকর বলেন, ‘আমাদের আগের প্রজন্ম জানে, কিন্তু আমরা জেন-জি—আমরা তো প্রায় কিছুই জানি না।’
পাকিস্তানে ‘বাসন্ত’ উৎসবটি মূলত বসন্ত ঋতুর সূচনা উপলক্ষে শত শত বছর ধরে পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ধারালো ও শক্ত সুতা, ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে যাওয়া এবং উৎসব উপলক্ষে আকাশে গুলি ছোড়ার ঘটনায় অতীতে দেশটিতে অসংখ্য দুর্ঘটনায় বহু মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য এটি ছিল মারাত্মক—রাস্তায় ঝুলে থাকা ঘুড়ির সুতা গলায় পেঁচিয়ে অহরহই প্রাণহানি ঘটেছে।
তবে এবার উৎসবকে নিরাপদ রাখতে পাকিস্তান সরকার একাধিক কড়াকড়ি ব্যবস্থা নিয়েছে। এবারের ‘বাসন্ত’ উৎসব সীমিত করা হয়েছে মাত্র তিন দিনে। বড় আকারের ঘুড়ি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ সেগুলোর জন্য প্রয়োজন হয় শক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ সুতা। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ বিপজ্জনক সুতা ও ফেব্রুয়ারির আগে বিক্রি হওয়া ঘুড়ি জব্দ করা হয়েছে। লাহোর পুলিশ জানিয়েছে, তারা এক লাখের বেশি ঘুড়ি ও দুই হাজারের বেশি সুতার রিল জব্দ করেছে।
সাবধানতা হিসেবে মোটরসাইকেল আরোহীদের হ্যান্ডেলের মাঝে ধাতব দণ্ড লাগানো হয়েছে, যাতে সুতা তাঁদের গলায় না জড়ায়। কিছু রাস্তায় জালও বসানো হয়েছে, কারণ অতীতে ধাতব সুতা বৈদ্যুতিক তারে পড়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টের ঘটনা ঘটিয়েছে। ড্রোন ও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে ছাদ ও আকাশ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
এদিকে নজিরবিহীন কড়াকড়ির মধ্যেও উৎসবের আনন্দে মেতেছে শহর। লাহোরের মোচি গেট এলাকায় ঘুড়ি বিক্রেতা উসমান জানান, গত কয়েক দিনে তিনি সাত হাজারের বেশি ঘুড়ি বিক্রি করেছেন। সংস্কৃতি অনুরাগী ইউসুফ সালাহউদ্দিন বলেন, বাসন্ত শুধু উৎসব নয়, লাহোরের আত্মার অংশ। তাঁর ভাষায়, ‘ঘুড়ি ছাড়া আমি এই শহরকে কল্পনাই করতে পারি না।’