পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভের কেন্দ্রে থাকা জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (জেকেজেএএসি) ভারতের মদদ পাওয়ার অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। সংগঠনটির দাবি, তাদের আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর সঙ্গে ভারতের কোনো সাংগঠনিক, আর্থিক বা পরিচালনাগত সম্পর্ক নেই।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সংগঠনটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এস এ খান বলেন, ‘আমরা ভারতের কাছে জবাবদিহি করি না। যদি সরকার বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ করে, তাহলে তার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ করুক।’
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। প্রাণঘাতী সংঘর্ষ, ইন্টারনেট বন্ধ, সাংবাদিকদের ওপর বিধিনিষেধ এবং পুলিশি দমন-পীড়নের অভিযোগের মধ্যেই সেখানে আঞ্চলিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল বিদ্যুৎ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে। পরে তা রাজনৈতিক সংস্কার, জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে রূপ নেয়।
ইসলামাবাদ শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছে, আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি ভারতের সমর্থনপুষ্ট এবং নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা তৈরির উদ্দেশে কাজ করছে। জুন মাসে পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার দাবি করেন, তদন্তে ভারতের সঙ্গে যুক্ত একটি ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা নিষিদ্ধ সংগঠনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রচারণায় অর্থায়ন করেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ডিজিটাল বিপণন সেবাদাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ভারতীয় পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অর্থ লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে এস এ খান বলেন, ‘ভারত সরকারের কোনো বক্তব্য বা নির্বাচন নিয়ে মন্তব্যের অর্থ এই নয় যে, আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন বিদেশি সরকার নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে মন্তব্য করতে পারে, কিন্তু তার জন্য আমাদের দায়ী করা যায় না।’
তিনি আরও বলেন, জেকেজেএএসি একটি শান্তিপূর্ণ ও অহিংস আন্দোলন। সরকার যেভাবে এটিকে সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করছে, তা সত্য নয়। একই সঙ্গে তিনি সরকারের অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হচ্ছে আঞ্চলিক আইনসভায় ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আসা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন। আন্দোলনকারীদের দাবি, যারা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে বসবাস করেন না, তাদের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্থানীয় সরকার গঠনে ভূমিকা রাখা উচিত নয়। তবে তারা শরণার্থীদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার পক্ষে নয়; বরং প্রতিনিধিত্ব ও ভোটাধিকার ব্যবস্থায় সংস্কার চায়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। জম্মু কাশ্মীর হিউম্যান রাইটস অবজারভেটরির নথি অনুযায়ী, ৩ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ৮৮ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানায়, অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৪ জন বেসামরিক এবং ছয়জন নিরাপত্তা সদস্য।
এস এ খান বলেন, প্রতিটি মৃত্যুই দুঃখজনক। তিনি বেসামরিক নাগরিক, পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর নিহত সদস্যদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করে থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তবে পুরো আন্দোলনকে দোষারোপ করা গ্রহণযোগ্য নয়।
তাঁর মতে, এই সংকটকে কেবল নিরাপত্তা সমস্যা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সংশ্লিষ্ট বিরোধ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। ভবিষ্যতের জন্য তিনি দুটি পথের কথা উল্লেখ করেন—একটি আরও সহিংসতা ও দমন-পীড়নের, অন্যটি পারস্পরিক উত্তেজনা কমিয়ে আন্তরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের।