কোন দেশের কাছে কতটি পারমাণবিক অস্ত্র আছে—এটি বড় প্রশ্ন নয়। বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সংকট দেখা দিলে প্রথম কে এই অস্ত্রের ট্রিগারে চাপ দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের পর আর কোনো যুদ্ধে এ অস্ত্র ব্যবহার হয়নি। তবে এরপর আরও অনেক দেশ পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছে। একই সঙ্গে এসব অস্ত্র আগের চেয়ে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কোনো সংঘাতে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা কোন দেশের সবচেয়ে বেশি—এমন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন চীনা বংশোদ্ভূত কানাডীয় শিক্ষাবিদ ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জিয়াং শুয়েচিন। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রতিবেশী পাকিস্তানের নামই সবার আগে আসে।
সম্প্রতি ভারতীয় ইউটিউবার রাজ শামানির পডকাস্টে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে এ মন্তব্য করেন জিয়াং। সাক্ষাৎকারটির ভিডিও গত ১১ আগস্ট প্রকাশ করা হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার ওই আলোচনায় ভবিষ্যৎ সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে কোনো একটি দেশ প্রথমে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তবে তাঁর অনুমান, পাকিস্তানের সম্ভাবনাই বেশি।
অবশ্য জিয়াং নিকট ভবিষ্যতে পরমাণু যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বাভাস দেননি। তিনি বলেছেন, তাঁর জীবদ্দশায় কোনো দেশই পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি না যে, আমাদের জীবদ্দশায় কখনো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হবে। কারণ এই অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি সর্বজনীন নিষেধাজ্ঞার মানসিকতা রয়েছে।’
তবে এরপর নিজের বক্তব্যের একটি ব্যতিক্রম তুলে ধরে জিয়াং বলেন, ‘যদি আমাকে অনুমান করতেই হয়, কোন দেশ প্রথমে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, তাহলে বলব ভারত বা পাকিস্তান। সম্ভবত পাকিস্তান।’
জিয়াংয়ের মতে, পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা দেশটির যুদ্ধ করার ইচ্ছার চেয়ে তার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত।
তিনি পাকিস্তানকে ‘অত্যন্ত দুর্বল, বিশৃঙ্খল ও একটি দুর্নীতিগ্রস্ত’ দেশ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর আশঙ্কা, জরুরি পরিস্থিতিতে দেশটির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হয়তো পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ঠেকানোর জন্য যথেষ্ট কার্যকর নাও হতে পারে।
জিয়াং বলেন, ‘পারমাণবিক অস্ত্র থাকা দুর্বল, বিশৃঙ্খল ও একটি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ পাকিস্তান। জরুরি পরিস্থিতিতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হয়তো তাদের নাও থাকতে পারে।’
প্রসঙ্গত, জিয়াংয়ের এই মন্তব্যের আগে থেকেই তাঁর পরিচয় নিয়ে একটি বিষয় আলোচনায় রয়েছে। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাংবাদিক মেহেদি হাসানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছিলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে কোনো অধ্যাপক নন। মানুষ তাঁকে অধ্যাপক বলে ডাকতে শুরু করেছে।
জিয়াংয়ের বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতির পার্থক্য। তাঁর মতে, দুই দেশের পারমাণবিক কৌশল এক নয়।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ বা আগে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার না করার নীতি ঘোষণা করে আসছে। যদিও সময়ের সঙ্গে এ নীতি নিয়ে বিতর্ক ও কিছুটা পরিবর্তনের আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি গ্রহণ করেনি। বরং ভারতের তুলনামূলক বড় প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
জিয়াংয়ের যুক্তি, প্রচলিত সামরিক শক্তির ক্ষেত্রে ভারত এগিয়ে থাকায় পাকিস্তানই তুলনামূলকভাবে বেশি চাপে থাকে। তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে টিকে থাকতে পাকিস্তানের তা ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে। এ কারণেই ভারত-পাকিস্তান সংঘাত যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে পাকিস্তানের নেতৃত্ব দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করে, তখন পরমাণু অস্ত্র কেবল প্রতিরোধের হাতিয়ার না থেকে শেষ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ভারতের কাছে প্রায় ১৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ১২টি ওয়ারহেড মোতায়েন করা হয়েছে। পাকিস্তানের কাছে রয়েছে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড। তবে পাকিস্তান কোনো পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েন করেনি বলে এসআইপিআরআই-এর তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই দেশের এই অস্ত্রভান্ডার মূলত পারস্পরিক প্রতিরোধের ভারসাম্য ধরে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের টানাপোড়েনে দুই দেশের নেতাদের বক্তব্যে মাঝেমধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
২০০২ সালে ভারত-পাকিস্তান সামরিক উত্তেজনার পর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বলেছিলেন, দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়লে পাকিস্তান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের পথে যেতে পারে।
২০১৯ সালে পুলওয়ামায় সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা চালালে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। তখন পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সতর্ক করেছিলেন, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে তা পরমাণু যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে।
২০২৫ সালের মে মাসে পেহেলগামে ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ‘অপারেশন সিঁদুর’ ঘিরে সামরিক সংঘাতের সময়ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসঙ্গ ওঠে।
ওই সময় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, দেশের অস্তিত্বের সংকট তৈরি হলে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে। তবে পরে তিনি এটিকে ‘খুবই দূরের সম্ভাবনা’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এই মুহূর্তে এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারও বলেছিলেন, ইসলামাবাদের পারমাণবিক ওয়ারহেড ব্যবহারের কোনো ইচ্ছা নেই এবং দেশটির প্রচলিত সামরিক সক্ষমতাই যথেষ্ট।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পরে বলেন, তাঁদের পারমাণবিক কর্মসূচি আগ্রাসনের জন্য নয়। এর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ ও জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য। প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিও পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে ‘ন্যূনতম প্রতিরোধ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের বক্তব্যও জিয়াংয়ের বিশ্লেষণকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় এক নৈশভোজে বলেছিলেন, ‘আমরা একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। আমরা যদি মনে করি যে, আমরা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছি, তাহলে বিশ্বের অর্ধেককে সঙ্গে নিয়ে যাব।’
পাকিস্তানের পানি সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কোনো ভারতীয় বাঁধ ধ্বংসের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে আসিম মুনিরের বিরুদ্ধে।
জিয়াংয়ের মতে, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের পারমাণবিক কৌশলের ভিত্তিই হলো প্রচলিত সামরিক দুর্বলতার ঘাটতি পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে পূরণ করা। ভারতের তুলনামূলক বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিপরীতে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র দেশটির জন্য একটি প্রতিরোধব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।
তবে তিনি বলেননি যে, পাকিস্তান পারমাণবিক বোমা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাঁর উদ্বেগ মূলত এমন একটি পরিস্থিতি নিয়ে, যেখানে প্রচলিত যুদ্ধ এতটাই তীব্র হয়ে উঠল যে পাকিস্তানের নেতৃত্ব মনে করল—দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিরোধের হাতিয়ার থেকে ‘শেষ অবলম্বনে’ পরিণত হতে পারে বলে মনে করেন জিয়াং।
তবে নিজের সামগ্রিক অবস্থান আবারও স্পষ্ট করে তিনি বলেন, ‘আবারও বলছি, ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি আমাদের জীবদ্দশায় পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা শূন্য শতাংশ।’ আর সেই শূন্য সম্ভাবনাই যদি কোনো দিন বাস্তবে পরিণত হয়, তাহলে প্রথম পারমাণবিক বোমা হামলার পথ ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত হয়েই খুলতে পারে।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে