পাকিস্তানে ধর্ম অবমাননার (ব্লাসফেমি) অভিযোগকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তত্ত্বাবধানে উগ্র ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের ফলেই এই পরিবর্তন এসেছে বলে সরকার, নিরাপত্তা সূত্র ও বিশ্লেষকদের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
গত মাসে করাচিতে একটি খ্রিষ্টান পরিবারের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠার পর শত শত মানুষ জড়ো হলেও পুলিশ পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। পুলিশ কর্মকর্তা সানঘার আলি মালিক বলেন, তিনি জনতাকে কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝান যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। অতীতে এই ধরনের ঘটনায় উগ্র সংগঠনের নেতারা জনতাকে উসকে দিতেন, কিন্তু এবার তাদের অনুপস্থিতিতে ভিড় দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে তদন্তে অভিযোগটি মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কমিশন অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত ধর্ম অবমাননার মামলা মাত্র ১৩ টি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর একই সময়ের তুলনায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কম। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা (এসিএলইডি) জানিয়েছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছর গড়ে সাতটির বেশি ধর্ম অবমাননাকেন্দ্রিক হামলা বা দাঙ্গা হলেও গত এক বছরে এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র একটি।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তোলা, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনীতিকে আরও সংযুক্ত করার লক্ষ্যেই এই কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পাকিস্তানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি হওয়ায় উগ্রপন্থী সহিংসতা বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
অভিযানের অংশ হিসেবে গত বছরের শেষ দিকে কট্টরপন্থী সংগঠন তেহরিক-ই-লাব্বাইক পাকিস্তান (টিএলপি) নিষিদ্ধ করা হয়। সংগঠনটির বহু নেতাকে গ্রেপ্তার, মসজিদ সিলগালা এবং ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। সরকারি নথিতে টিএলপিকে দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আন্তর্জাতিক সুনামের জন্য ‘গুরুতর হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা উগ্রবাদী নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি নির্মূল করা সহজ হবে না। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রয়োজন দেখা দিলে এসব গোষ্ঠী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
খ্রিষ্টান, শিয়া ও আহমদিয়া সংখ্যালঘুদের কাছে পরিস্থিতির এই পরিবর্তন স্বস্তিদায়ক হলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি। করাচিতে উদ্ধার হওয়া খ্রিষ্টান পরিবারের এক নারী রয়টার্সকে বলেন, ‘এখন আমরা শারীরিকভাবে নিরাপদ, কিন্তু ভয় এখনে আমাদের ছেড়ে যায়নি।’