হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ফের হামলা হলে ভারত মহাসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে আঘাত হানা হুঁশিয়ারি ইরানের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করলে ভারত মহাসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছে তেহরান। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার এই হুমকি দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ ইউকের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ইরান যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবারও ইরানে বোমা হামলার অভিযান শুরু হতে পারে।

আইআরজিসি নৌবাহিনীর উপ-রাজনৈতিক কমান্ডার আলী মোহাম্মাদি আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া মন্তব্যে বলেন, ‘আবার যদি যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে তাদের জাহাজ ও ডেস্ট্রয়ারগুলোতেও হামলা চালাব এবং ধ্বংস করব। এমনকি ভারত মহাসাগরে হলেও।’

ভারত মহাসাগর হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ প্রবেশমুখ থেকে অনেক দূরে। চলমান সংঘাতের সময় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই এই প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকাংশে বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানের এই ধরনের হুমকি বাস্তবে কার্যকর হলে ইরান যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হবে। এরই মধ্যে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে সংঘাতের মধ্যে টেনে নিয়েছে।

ইরানের এক সেনা মুখপাত্রও বলেছেন, আঞ্চলিক পরিস্থিতি প্রতিকূল থাকায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালাতে পারে বলে ইরান মনে করে এবং ভবিষ্যতের যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত। একই সময়ে ইরানের অন্যান্য কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হলো কূটনীতি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার দিকে যেকোনো পদক্ষেপ আমাদের শর্তগুলো পূরণ করার ওপর নির্ভরশীল। শুধু আলোচনার মাধ্যমে পাওয়া একটি সমাধানই তাদের এই অচলাবস্থা থেকে বের করে আনতে পারে।’

গত শনিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সর্বশেষ সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, সাত দিনের যুদ্ধবিরতির পর নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে। ইরানের পক্ষ থেকে উত্থাপিত শর্তগুলো যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই মোটামুটি একই রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সব ধরনের শত্রুতা বন্ধ করা, ইরানের প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বা ৯ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের জব্দ করা সম্পদ ছেড়ে দেওয়া, ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা এবং ইরানের ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুক্তি, ইরান এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে সংঘাত শেষ করতে তারা একটি চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার জন্য একটি চুক্তি করতে চায়, কারণ তারা এত ভয়াবহভাবে হারছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি হরমুজ প্রণালির একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে এর নাম ‘ট্রাম্প স্ট্রেইট’ লেখা ছিল।

ইরান আলোচনার অংশ হিসেবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দিতে রাজি হবে কি না, তা নিয়ে গণমাধ্যমে পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব আলোচনা মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। শুক্রবার ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব মেনে নিলেও পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ইরান কোনো নমনীয়তা দেখাবে না। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পরদিনই ওই একই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক দ্য ন্যাশনাল জানিয়েছে, তেহরানের অবস্থান সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের বরাতে, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করা তাদের ইউরেনিয়ামের মজুত তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তরের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামে পরিণত করতে প্রযুক্তিগতভাবে আর মাত্র একটি ধাপ বাকি থাকে। এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব এবং এতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং কেবল বেসামরিক ব্যবহারের জন্য। তবে ট্রাম্প তেহরানের সরকারকে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করেছেন। গত বছর ১২ দিনের যুদ্ধে তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। চলতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও তিনি একই হুমকি দিয়েছেন।

ইরানের কর্মকর্তারাও তাদের কঠোর অবস্থান অব্যাহত রেখেছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানম মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানকে ভয় দেখিয়ে দমিয়ে রাখা যাবে না। গত সপ্তাহের বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণেও তিনি একই বার্তা দিয়েছিলেন।