চীনের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় (এমএসএস) ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নতুন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়েছে। আবার যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আধুনিক যুদ্ধবিমান মোকাবিলায় তেহরানকে সক্ষম করে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি মডার্ন ডিপ্লোম্যাসিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বেইজিং মিত্র তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলে তৈরি সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ করার পরামর্শ দিচ্ছে। এর বদলে চীনে তৈরি ক্লোজড ও এনক্রিপ্টেড সিস্টেম ব্যবহারের কথা বলছে, যেগুলোতে অনুপ্রবেশ করা কঠিন। এর অংশ হিসেবে ইরানকে উন্নত চীনা সেন্সর সিস্টেম ও রাডার সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ওয়াইএলসি–৮বি রাডার, যা স্টেলথ বিমান শনাক্ত করতে এবং ইলেকট্রনিক নজরদারি চালাতে সক্ষম।
প্রতিরক্ষা বিষয়ক ম্যাগাজিন ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া জানায়, বিশ্লেষকদের মতে, ‘ওয়াইএলসি–৮বি রাডার সিস্টেম বিশ্বের অল্প কয়েকটি রাডারের একটি, যা দীর্ঘ দূরত্ব থেকে পশ্চিমা পঞ্চম প্রজন্মের (স্টেলথ) বিমানকে ধারাবাহিকভাবে শনাক্ত ও অনুসরণ করতে পারে।’
ওয়াইএলসি–৮বি রাডার রাডারটি তৈরি করেছে চীনের নানজিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রনিকস টেকনোলজি। এটি ইউএইচএফ ব্যান্ডের লো-ফ্রিকোয়েন্সির নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত যুদ্ধবিমানে ব্যবহৃত রাডার-শোষণকারী নকশার কার্যকারিতা কমিয়ে দেওয়া যায়। যেমন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও বি–২ স্পিরিট বোমারু বিমান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর বহরে ৪৮টি এফ–৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান রয়েছে।
এ ছাড়া বেইজিং ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি জিপিএস ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে চীনের বেইডুয়ো স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সিস্টেম ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে। উদ্দেশ্য হলো, সম্ভাব্য কারসাজি এড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যাতে দেশের ভেতরে ইরানের লক্ষ্যবস্তু ট্র্যাক করতে না পারে।
এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য নৌ ও বিমান শক্তি জড়ো করেছে। এতে ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার হুমকি তৈরি হয়েছে। চীন ইরানে তাদের বিশাল বিনিয়োগ রক্ষায় তেহরানকে সহায়তা করতে চাইছে। এই বিনিয়োগ করা হয়েছে ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তির আওতায়, যা বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ।
বেইজিংয়ের আশঙ্কা, ওয়াশিংটন যদি হামলা চালায় এবং এর ফলে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইরানি তেলের প্রবেশাধিকার হারাতে পারে চীন। ইরান চীনের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহকারী দেশ। আর ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
ইরানকে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করার চেষ্টা করলেও, বেইজিং স্পষ্ট করেছে যে যুদ্ধ শুরু হলে তারা সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করবে না। চীনের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—দুই দেশের সঙ্গেই বিস্তৃত অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই সামরিক সহায়তার বদলে চীন কূটনৈতিক পরিসরে সমর্থন সীমিত রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল যদি কোনো উসকানিহীন হামলা চালায়, তাহলে সেটিকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে নিন্দা জানাবে বেইজিং।
এ ছাড়া, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চীন সতর্ক। এই কারণেই তারা বারবার সংযমের আহ্বান জানায় এবং কূটনৈতিক সমাধানে ফেরার কথা বলে, যাতে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ‘বিপর্যয়কর পরিণতি’ এড়ানো যায়।
তথ্যসূত্র: দ্য ক্রেডল