সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবন লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। ভবনটি দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দাহরানে অবস্থিত। সৌদি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার হামলার ফলে সৃষ্ট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।
আরামকোর এক কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, দাহরানে কোম্পানিটির সদর দপ্তর কমপ্লেক্সে একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। কমপ্লেক্সের একটি অফিস টাওয়ারে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত করে। এতে ভবনটির ওপরের তিনটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ওই কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট আরও দুজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেন, ভবনটিতে আগুন জ্বলছিল।
কমপ্লেক্সটিতে আরামকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাকেন্দ্র রয়েছে। এই কেন্দ্র থেকে কোম্পানিটির বিশাল স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক তেল উত্তোলন স্থাপনা, পাইপলাইন, শোধনাগার এবং তেল রপ্তানির টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম তদারক করা হয়।
এসপিএ আরও জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে সৌদি আরব। দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, দুটি প্রতিহত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন এবং ১৫টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এর আগে হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ আখ্যা দিয়ে বেসামরিক লোকজনকে সেসব এলাকা থেকে সরে যাওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছিল।
ইয়েমেনর সানায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার জবাবে এ হামলা চালিয়েছে হুতিরা। হুতিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারির এই সতর্কবার্তার পেছনে ছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি নির্দেশ। ওই নির্দেশে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের রাজধানী সানার আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যেতে বলা হয়েছিল। জোটের ওই নির্দেশের জবাবে সারি সতর্ক করে বলেছিলেন, সানায় কোনো হামলা চালানো হলে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ পাল্টা জবাব দেওয়া হবে।
এর আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুতিদের জ্বালানি স্থাপনা ও জ্বালানির মজুত লক্ষ্য করে হামলা চালায়। জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকির সতর্কতার কিছুক্ষণ পর সানায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। মালিকি সতর্কতায় বলেছিলেন, বেসামরিক মানুষের যাতে ‘পার্শ্বক্ষয়ক্ষতি’ না হয়, তা এড়াতে বাহিনী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, সৌদি সমর্থিত বাহিনী রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হুতিরা হামলার আশঙ্কা আগে থেকেই করেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইয়েমেনের তেল কোম্পানি জানিয়েছিল, তাদের তেল সংরক্ষণাগারগুলো খালি রয়েছে। ফলে সৌদি হামলায় তেলের মজুত বা বাসিন্দাদের সরবরাহে প্রভাব পড়বে না।
তা সত্ত্বেও তেলের সংকট দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কায় শহরের কয়েকটি পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। আল-জাজিরার প্রতিবেদক ইউসুফ মাওরি বলেন, ‘সৌদি আরব যখন রাজধানী সানায় ইয়েমেনের আল-সাবাহ কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়, তখন আমরা বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পাই।’
মাওরি আরও জানান, সৌদি আরব আরও দুটি দফায় বিমান হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি হামলায় রাস ঈসা বন্দরের ইয়েমেনি তেল সংরক্ষণ ট্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। অন্য হামলাটি চালানো হয় হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা হোদেইদা প্রদেশের একটি তেল স্থাপনায়।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেন, হুতিরা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের অস্ত্রভান্ডার হিসেবে ওই স্থাপনা এবং এর ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ব্যবহার করছে।
বিস্ফোরণের খবর প্রকাশের পর ইয়াহিয়া সারি জানান, সানায় সৌদি সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে হুতি যোদ্ধাদের সংঘর্ষ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে সারি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সানায় হামলা চালালে যেসব স্থাপনা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে হুতিরা।
এরই অংশ হিসেবে গতকাল মঙ্গলবার বেসামরিক নাগরিকদের দাহরানে আরামকোর সদর দপ্তর, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রিয়াদে আরামকোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শোধনাগার এলাকা থেকে সরে যেতে বলা হয়েছিল।
এর আগে শনিবার রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এতে বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়। রোববার রিয়াদের বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্য কোনো উড়ন্ত বস্তু আঘাত হানলে আরও একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন।