ইসরায়েলের দক্ষিণ লেবানন দখলের পরিকল্পনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কানাডা। সতর্ক করে দেশটি বলেছে, লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা ‘অবশ্যই লঙ্ঘন করা যাবে না’। উত্তরের প্রতিবেশী দেশটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর বড় ধরনের স্থল অভিযানের প্রস্তুতির মধ্যেই এমন সতর্কবার্তা দিল কানাডা।
লেবাননের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার (১৮.৬ মাইল) ভেতর পর্যন্ত এলাকা দখল ও নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েল। এই প্রস্তুতির মধ্যেই দেশটিতে নিহতের সংখ্যা অন্তত ১ হাজার ৭২ জনে পৌঁছেছে। চলতি মাসের শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়েছেন আরও প্রায় ৩ হাজার মানুষ।
কয়েক সপ্তাহের ইসরায়েলি হামলায় দেশটির দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চল এবং রাজধানী বৈরুতে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। স্থল অভিযানের আশঙ্কা বাড়তে থাকায় সম্ভাব্য মানবিক সংকট নিয়ে সব পর্যায়েই সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
লেবানন সরকার ও জনগণের প্রতি ‘সংহতি’ প্রকাশ করে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার এক বিবৃতিতে বলেছে, সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে অবশ্যই ‘আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে’।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা সব পক্ষকে বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দিতে, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যকর্মী ও শান্তিরক্ষীদের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানাই।’
এর আগে মঙ্গলবার ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারোও ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন দখলের পরিকল্পনা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বারো বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে এ ধরনের স্থল অভিযান থেকে বিরত থাকার জন্য জোরালো আহ্বান জানাই। কারণ, এর ফলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে এবং দেশটির বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হবে।’
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী সীমান্ত থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত লিটানি নদী পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরই ফ্রান্স ও কানাডার পক্ষ থেকে এই বিবৃতিগুলো এল।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ বলেছেন, সামরিক বাহিনী ‘লিটানি নদী পর্যন্ত নিরাপত্তা অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করবে’। ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত লেবাননের বাস্তুচ্যুতদের নদীর দক্ষিণাঞ্চলে তাদের ঘরবাড়িতে ফিরতে দেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গাজায় ইসরায়েলের চালানো গণহত্যার স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে কাৎজ বলেন, লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী রাফাহ ও বেইত হানুন মডেল অনুসরণ করছে। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের এই দুটি শহরই যুদ্ধের সময় কার্যত মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে সোমবার ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মটরিচ আরও এক ধাপ এগিয়ে দক্ষিণ লেবাননকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। তিনি মনে করেন, ‘ইসরায়েলের সীমানা পরিবর্তন’ করা প্রয়োজন।
এক সাক্ষাৎকারে স্মটরিচ বলেন, ‘আমি এখানে এবং প্রতিটি আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলছি, ইসরায়েলের নতুন সীমানা হতে হবে লিটানি নদী পর্যন্ত।’
এসব আলোচনার মাঝেই দক্ষিণ লেবাননে অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইসরায়েল লিটানি নদীর ওপরের সেতুগুলো এবং দুই দেশের সীমান্তবর্তী লেবাননের ঘরবাড়িতে বোমা হামলা চালিয়েছে। লেবাননের সেনাপ্রধান জোসেফাউন রোববার কাসমিয়েহ সেতুর ওপর ইসরায়েলি হামলাকে ‘স্থল অভিযানের পূর্বাভাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। দক্ষিণাঞ্চলে প্রবেশের জন্য এই সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বুধবার ভোরের দিকে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলায় অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন।
খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলির অভিযানে দক্ষিণ লেবাননের আদলুন শহরে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া মিয়েহ মিয়েহ শরণার্থী শিবিরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় দুজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছেন। এর আগে দক্ষিণের হাবৌশ শহরে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৮ জন আহত হন।
অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, উত্তর ইসরায়েলে বারবার বিমান হামলার সাইরেন বাজার পর বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। সেখানে লেবানন থেকে ছোড়া রকেট হামলায় মঙ্গলবার এক নারী নিহত হয়েছেন।