ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের জেরে লোহিতসাগরে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের ঘটনায় আবারও তেলের বাজার ব্যাপক অস্থির হয়ে উঠেছে। গত এক মাসে তেলের দাম বেড়েছে ব্যারেলপ্রতি ২০ ডলারের বেশি। হুতিদের হামলা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হতে পার এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চরম সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার হুতিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধের ঘোষণা দেয়। এরপর আজ বৃহস্পতিবার তারা জানায়, এই প্রণালিতে তারা দুটি সৌদি আরবের ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বাব আল-মান্দেব অবরোধের ঘোষণার পরপরই এই প্রণালিতে তেলের ট্যাংকারের চলাচল কমে গেছে। এখন পর্যন্ত হুতিরা পুরোপুরিভাবে অবরোধ কার্যকর না করলেও শুধু হুমকি ও আজকের হামলার জেরে কিছু জাহাজ দক্ষিণ মুখে লোহিতসাগর পাড়ি দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। হুতিরা যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধ কার্যকর করতে পারে, তবে তা চলমান সংঘাতে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলে দিতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হতে পারে। যা তাদের হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি সৌদি আরব থেকে ইউরোপে ডিজেল রপ্তানিও ব্যাহত হতে পারে।
হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মান্দেব একটি কৌশলগত জলপথ; এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জাহাজ চলাচল করে। পণ্য পরিবহনের তথ্য বিশ্লেষণকারী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুসারে, হরমুজ প্রণালির মতো বাব আল-মান্দেব ততটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও গত মাসে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৬২ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ হয়েছে। এই তেলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সৌদি আরব তার সুবিশাল পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিতসাগরের প্রধান বন্দর ইয়ানবুতে পাঠিয়েছে।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটের গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজির প্রধান হেলিমা ক্রফ্টের মতে, সৌদি আরব পারস্য উপসাগর থেকে ইয়ানবু হয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল সরিয়ে নিয়েছে। ক্রফ্ট বলেন, যদি এই রুট অকার্যকর হয়ে পড়ে, তবে তেল সরবরাহের চলমান সংকট আরও গুরুতর হয়ে উঠবে এবং বিকল্প কোনো পথ খোলা থাকবে না।
পিকারিং এনার্জি পার্টনারসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিংয়ের মতে, বাব আল-মান্দেব সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলে তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে। ব্যারেলপ্রতি কমপক্ষে পাঁচ থেকে ১০ ডলার বাড়তে পারে এবং তা ১০০ ডলার ছাড়াবে। ড্যান পিকারিংয়ের এই পূর্বাভাস আজই প্রায় মিলে গেছে। কারণ, এ দিন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের প্রতি ব্যারেলের দাম প্রায় ৯৮ ডলার ছিল।
জাহাজগুলো যদি লোহিতসাগরে যেতে না পারে, তাদের একমাত্র বিকল্প হবে উত্তরের সুয়েজ খাল। এ ক্ষেত্রে জাহাজগুলো ভারত মহাসাগরের পরিবর্তে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়বে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সৌদি আরবের তেলের বৃহত্তম গ্রাহক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। কারণ, তাদের পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে।
লিপো অয়েল অ্যাসোসিয়েটসের সভাপতি অ্যান্ডি লিপোর মতে, ইরান যুদ্ধের সময় অপরিশোধিত তেল সরবরাহ সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কারণ, তাদের তেল উৎপাদনে সক্ষমতা নেই। সৌদি আরব ইয়ানবু দিয়ে তেল পাঠিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে খানিকটা স্বস্তি দিয়েছিল। কারণ, বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ইয়ানবু থেকে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। এই প্রণালি বন্ধ হলে সেই সরবরাহও আটকে যাবে।
হুতিদের হুমকি ইউরোপের জন্যও দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে। কেপলারের অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষণের প্রধান হোমায়ুন ফালাকশাহির মতে, সৌদি আরব ইয়েমেনের নিকটবর্তী শোধনাগার থেকে সুয়েজ খালের মাধ্যমে প্রায় ২৩ লাখ ব্যারেল ডিজেল পাঠায় ইউরোপের দেশগুলোয়। এই রুট হুতিদের আক্রমণের ঝুঁকিতে আছে।
হুতিরা গত মঙ্গলবার সৌদি জাহাজগুলোকে লোহিতসাগর এড়িয়ে চলতে বার্তা দিয়েছে এবং কিছু জাহাজ এই বার্তা গুরুত্বসহকারে নিয়েছে। কেননা, হুতিরা যুদ্ধের শুরুতে ওই অঞ্চলে জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। উইন্ডওয়ার্ড ইন্টেলিজেন্স অনুসারে, ঘোষণার পর পাঁচটি ট্যাংকার ইউটার্ন নিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরচুন-৫০০-এর একজন ঝুঁকি ব্যবস্থাপক সিএনএনকে বলেন, গত মঙ্গলবার চীনের উদ্দেশে তেল নিয়ে ইয়ানবু ছেড়ে যাওয়া একটি ট্যাংকার হুতিদের হুমকির মুখে ইয়েমেন সীমান্তে ফিরে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ওভাল অফিসে বলেছেন, হুতিরা আরও গুরুতর পদক্ষেপ নিলে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
বাস্তবতা হলো, মার্কিন নৌবাহিনী ইরানি বন্দর অবরোধ করতে ব্যস্ত এবং হরমুজ প্রণালি পারাপারের জন্য শিপিং কোম্পানিগুলোকে রাজি করাতে হিমশিম খাচ্ছে। ইরান গত কয়েক দিনে তেলের একাধিক ট্যাংকারে আঘাত হেনেছে, প্রণালির ট্রাফিককে কেবল কয়েকটি ক্রসিংয়ে ধীর করে দিয়েছে। যদি মার্কিন সামরিক বাহিনীর নতুন একটি ফ্রন্টে যুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়, তবে তারা আরও চাপে পড়বে।
সিএনএন থেকে অনুবাদ করেছেন রাফসান জানি