দীর্ঘ ১৮ মাসের নিবিড় আলোচনার পর তারতুস ও হামেইমিমে থাকা রুশ সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সিরিয়া ও রাশিয়া একটি সমঝোতা স্মারকে পৌঁছেছে। সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল রোববার এই তথ্য জানিয়েছে। সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, হামেইমিম বিমানবন্দর এবং তারতুস বন্দরের বাণিজ্যিক জেটিসহ বেসামরিক স্থাপনাগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিরিয়ার রাষ্ট্র গ্রহণ করবে। এর ফলে এসব স্থাপনা ধীরে ধীরে দেশটির বেসামরিক প্রশাসনের আওতায় একীভূত করা সম্ভব হবে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, নতুন ব্যবস্থার অধীনে সামরিক স্থাপনাগুলোকে যৌথ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নকেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে। এতে উভয় পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষিত থাকবে এবং এই রূপান্তর প্রক্রিয়া তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে।
ভূমধ্যসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রধান সামরিক ঘাঁটি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে তারতুসে রুশ নৌঘাঁটি এবং হামেইমিম বিমানঘাঁটি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে এসব ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছে রাশিয়া।
অন্য এক বিবৃতিতে সিরিয়ার বন্দর ও শুল্কবিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারতুস বন্দরে আগে রাশিয়ার পরিচালনায় থাকা বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণ সিরিয়া গ্রহণ করবে। এর মধ্যে রয়েছে ৪ নম্বর জেটি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুদাম ও অন্যান্য স্থাপনা।
গত মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল, রাশিয়া তারতুস বন্দরে একটি বাণিজ্যিক লজিস্টিকস হাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল। এর জন্য ৪ নম্বর জেটি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল। জেটিটি নৌঘাঁটির বাইরে অবস্থিত একটি সীমিত-প্রবেশাধিকার এলাকা। সে সময় দুই পক্ষ জানিয়েছিল, প্রস্তাবিত লজিস্টিকস হাবটি সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণেই থাকবে এবং এর সব কার্যক্রম সিরিয়ার বন্দর ও শুল্কবিষয়ক সাধারণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের অধীন হবে।
এ বিষয়ে মস্কো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
এর আগে, ২০১১ সালে বাশার আল-আসাদ একটি গণঅভ্যুত্থানকে নির্মমভাবে দমন করার পর সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সেই সময় থেকেই রাশিয়া আসাদকে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। পরে ২০১৫ সালে মস্কো সিরিয়ার সরকারের পক্ষে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে। তবে ২০২২ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে আগ্রাসন শুরু করার পর থেকে এই অঞ্চলের গুরুত্ব রাশিয়ার কাছে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।
দুই বছর পর, শারার নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) আসাদ সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে অভিযান শুরু করলে রাশিয়া মূলত নীরবই ছিল। মস্কো কেবল অল্পসংখ্যক প্রতীকী বিমান হামলা চালায়, যা বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর রাশিয়া শত শত সামরিক ও বেসামরিক কর্মী সরিয়ে নিলেও, আফ্রিকায় রুশ অভিযান পরিচালনা এবং ভূমধ্যসাগরে রাশিয়ার উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য ওই ঘাঁটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কেন্দ্র হিসেবে থেকে যায়।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আসাদ ও তাঁর পরিবারকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেন। একই সময়ে তিনি শারার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলারও চেষ্টা চালিয়ে যান। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় রুশ বাহিনী যে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়েছিল, শারা একসময় সেগুলোরই একজন নেতা ছিলেন।
গত বছরের অক্টোবর মাসে শারা ক্রেমলিনে আলোচনার জন্য সফর করলে পুতিন দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহের ইঙ্গিত দেন। এরপর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আরেক বৈঠকে পুতিন শারাকে জানান, উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের (এসডিএফ) নিয়ন্ত্রণে থাকা নিজেদের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে সিরিয়ার প্রচেষ্টাকে রাশিয়া সমর্থন করে।
ওই বৈঠকের কিছুদিন আগে রাশিয়া ওই অঞ্চলের বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত কামিশলি ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরু করেছিল। পুতিন আরও বলেন, যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনর্গঠন এবং সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় সহায়তা করতে রাশিয়া প্রস্তুত রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সিরিয়া এখনও রুশ তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গত সপ্তাহে রয়টার্স জানায়, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চলমান আলোচনার অংশ হিসেবে দামেস্ক রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমাতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।