ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা বিস্ময়কর। তাদের দ্রুত সামরিক অগ্রযাত্রা স্থানীয় একটি পাহাড়ি মিলিশিয়া থেকে রাতারাতি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচল, সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
‘হুতি’ নামটি এসেছে উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশের একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিবার ও গোষ্ঠী থেকে। এই আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি ছিলেন একজন জায়দি ধর্মীয় নেতা ও রাজনীতিক। ২০০৪ সালে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে তিনি নিহত হন। এরপর তাঁর ভাই আবদুল-মালিক আল-হুতি আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে এর প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক নেতা হয়ে ওঠেন। বর্তমানে তিনিই হুতি আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখ। তাঁর আরেক ভাই আবদুলখালিক আল-হুতিও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতৃত্বে ছিলেন। হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’ বা আল্লাহর সমর্থক। তবে নেতৃত্বে হুতি পরিবারের প্রাধান্যের কারণেই এটি আন্তর্জাতিকভাবে ‘হুতি’ নামে পরিচিত।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে উত্তর ইয়েমেনে জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে হুতিদের উত্থান। হুতি পরিবারের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই গোষ্ঠী পরবর্তী সময়ে ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে ছয় দফা যুদ্ধে অংশ নেয় এবং একটি শক্তিশালী স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের পর ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে হুতিরা দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা বাড়াতে থাকে। একই সময়ে ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক জোট ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আবার বড় ধরনের সংঘর্ষ শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি হুতিরা ইয়েমেনের দক্ষিণ তিহামা উপকূলে দ্রুত অগ্রসর হয়ে মোখা বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এর ফলে তারা ১৯ কিলোমিটার প্রশস্ত বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান শক্ত করেছে।
এই প্রণালি লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যে সংযোগ তৈরি করেছে এবং বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। ফলে এখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহন এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানি উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন। এসব অস্ত্র দিয়ে তারা ইয়েমেনের বাইরে সৌদি আরব, ইসরায়েল এবং লোহিত সাগরের জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। ২০২৩-২৫ সালে গাজা যুদ্ধের সময়ও তারা ফিলিস্তিনিদের সমর্থনের কথা বলে ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বিরুদ্ধে হামলা চালায়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা বিদেশ থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের পাশাপাশি নিজেদের দেশেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন তৈরির সক্ষমতা বাড়িয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে অস্ত্রের উপাদান পাচারের বিভিন্ন ঘটনাও শনাক্ত করেছে জাতিসংঘ।
ইরান হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করলেও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে হুতিদের অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহে বহিরাগত সহায়তার বিষয়টি উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে হুতিদের যোদ্ধার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের কৌশলের মধ্যে রয়েছে ড্রোন হামলা, সীমান্তে অনুপ্রবেশ, গোলাবর্ষণ এবং মাইন ও বিস্ফোরক ব্যবহার।
সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রায় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর কাছ থেকে হুতিরা সাঁজোয়া যান, ট্যাংক, কামান ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও দখল করে নিয়েছে বলে তাদের প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে।
ফলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে একসময় পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকা হুতিরা এখন এমন এক সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যার কর্মকাণ্ডের প্রভাব পড়ছে লোহিত সাগরের নৌপথ, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইয়েমেনের ভেতরে এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলেও জানিয়েছে জাতিসংঘ।