ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার নতুন প্রধান মোহসেন রেজাই প্রতিবেশী দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি তেহরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগে যোগ দেয়, তাহলে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে হামলারও হুমকি দিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন কট্টরপন্থী প্রধান মোহসেন রেজাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহনের বিকল্প সমুদ্রপথগুলোকে ইরান লক্ষ্যবস্তু করবে, যদি প্রতিবেশী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চালানো কথিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ যোগ দেয়। তিনি বলেন, ওই দেশগুলোকে ‘শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে’ এবং ‘আমরা তাদের স্বার্থে আঘাত হানব।’
মোহসেন রেজাই ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ইরান-ইরাক যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির প্রধান কমান্ডার ছিলেন। চলতি মাসে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের অংশ হিসেবে তাঁকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়। এসব নিয়োগকে তেহরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান আরও কঠোর করার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাপকভাবে দেখা হচ্ছে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারটিই রেজাইয়ের সবচেয়ে বিস্তারিত প্রকাশ্য বক্তব্য। সাক্ষাৎকারে রেজাই আরও দাবি করেন, চলমান যুদ্ধে ইরানের হাতে এখনো অনেক ‘কার্ড বা তাস’ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো কোনো মার্কিন অর্থনৈতিক স্বার্থে হামলা করিনি।’
গতকাল শনিবার সম্প্রচারিত সাক্ষাৎকারে রেজাই বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা শুধু সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করেছি। কিন্তু তারা যদি আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের আশপাশে এবং অন্য জায়গায় তেল ও অর্থনৈতিক কোম্পানি রয়েছে। আমরা সেগুলোতে হামলা চালাব।’
গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার নতুন অভিযান ঘোষণা করেন। তিনি হুমকি দেন, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করবে বা দেশটিকে সহায়তা করবে, তাদের “ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি” ভোগ করতে হবে। এদিকে ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধ প্রায় ছয় মাসের দিকে এগিয়ে গেলেও এর কোনো উল্লেখযোগ্য সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের সঙ্গে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু করা যুদ্ধ শেষ করার ট্রাম্পের প্রচেষ্টাও ব্যর্থতার মুখে পড়েছে। জুনে স্বাক্ষরিত একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর ফলে ইরান বর্তমানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হতো। ওয়াশিংটন অন্যান্য দেশকেও ইরানের অর্থনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে চীনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, কারণ চীন ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার।
তবে বেইজিং এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে। চীনের বক্তব্য, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সমাধান করতে পারবে না। ইরানের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার সংযুক্ত আরব আমিরাত গত সপ্তাহের মঙ্গলবার ঘোষণা করে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তারা তেহরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যিক ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করছে।
অন্যদিকে, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় কয়েক মাস ধরে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ পরিচালনা করছে। এর লক্ষ্য হলো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের অর্থায়নের পথ বন্ধ করে দেওয়া। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে একটি নৌ অবরোধ চালিয়ে ইরানের বন্দরগুলো থেকে তেল রপ্তানি বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই তেল রপ্তানি ইরানের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত কয়েক দিনে ট্রাম্প বারবার হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ধারণার কথা বলেছেন। গত সপ্তাহের সোমবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবরোধের মাধ্যমে আমরা এটি নিয়ন্ত্রণ করছি, এবং এটিকে একটি ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ধারণাটি আমার ভালো লাগে।’
এরপর, গত শুক্রবার সাউথ ক্যারোলিনায় এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এমনকি জানিও না যে আমরা জিতেছি কি না, কারণ এই মুহূর্তে আমি হরমুজ প্রণালিকে আমেরিকান ভূখণ্ড হিসেবে দেখি।’ শনিবার রাতেও ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। ওই মানচিত্রে উপসাগরীয় অঞ্চল দেখিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
রেজাই তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেন, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রণালির অপর পাশের প্রতিবেশী দেশ ওমানের সঙ্গে আলোচনা এখনো চলছে। তিনি জানান, এই জলপথ ব্যবহারের জন্য ফি আরোপ করা হবে।
এদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গেছে। আজ রোববার থেকে শুরু হওয়া সৌদি যুবরাজের দুই দিনের প্যারিস সফরের সময় এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। তবে তারা প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ করেননি।
বিকল্প পথ তৈরির প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে উপসাগরের বাইরে ওমানের বন্দরগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়ানো, সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশে তেল পরিবহনের পাইপলাইন সম্প্রসারণ বা দ্বিগুণ করা এবং নতুন রেল যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা। ফ্রান্স ও সৌদি আরব ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থার সংযোগ উন্নয়নের জন্য একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
এই টাস্কফোর্স সোমবার মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক করবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করা, সেগুলোর অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং ফরাসি কোম্পানিগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।