হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ খুলে ফের আলোচনায় বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ফাইল ছবি

অবশেষে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে জ্বালানি পরিবহনের বাধা কাটল। লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির পর হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়েছে ইরান। এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা পাকিস্তানে শুরু হবে চলতি সপ্তাহেই। চুক্তি হলে তিনিও পাকিস্তান যেতে পারেন। হরমুজ খোলার ঘোষণার পর গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে জ্বালানি তেলের দাম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। এরপর আন্তর্জাতিক মহলের চাপের মুখে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পথে হাঁটেন ট্রাম্প। ৪০ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে লেবাননে ইসরায়েল হামলা চালিয়ে যাওয়ায় হরমুজ বন্ধই রাখে ইরান। এরপর ট্রাম্প ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ান হামলা বন্ধের। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ইসরায়েল এতে খুশি না হলেও ট্রাম্প নিজেই এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। গতকাল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইরান হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, গতকাল ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানান, লেবাননের যুদ্ধবিরতির মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। লেবাননে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়ে এই প্রণালি দিয়ে সব বাণিজ্যিক জাহাজ অতিক্রম করতে পারবে।

ইরানের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান ট্রাম্প। তবে ইরানের ওপর যে বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করেছেন, তা বজায় রাখার ঘোষণা দেন তিনি। আরাঘচির পক্ষ থেকে হরমুজ খুলে দেওয়ার ঘোষণা আসার পরপরই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টে জানান, হরমুজ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও ব্যবসার জন্য প্রস্তুত। তবে ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরে অবরোধ বজায় রাখবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে আমাদের লেনদেন ১০০% সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত শুধু ইরানের ক্ষেত্রে নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ বলবৎ থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, এই প্রক্রিয়া ‘খুব দ্রুত এগিয়ে যাবে’ কারণ অধিকাংশ বিষয় আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হয়েছে।

ইরানের সতর্কবার্তা

যুদ্ধবিরতির আলোচনার শুরু থেকে ইরান বলে আসছে, তারা সাময়িক কোনো যুদ্ধবিরতিতে যাবে না। আল জাজিরার খবরে বলা হয়, গতকাল এই সতর্কবার্তা আবারও উচ্চারণ করেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খাতিবজাদেহ। তিনি বলেন, তেহরান কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মানবে না। তাঁরা পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান চান।

তুরস্কে সাংবাদিকদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, যেকোনো যুদ্ধবিরতিতে সব সংঘাতপূর্ণ এলাকা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে—লেবানন থেকে লোহিতসাগর পর্যন্ত। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনো অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করছি না।’ তিনি বলেন, সংঘাতের চক্র এখানে সম্পূর্ণভাবে এবং অনন্তকালের জন্য শেষ হওয়া উচিত।

এ ছাড়া হরমুজ নিয়েও গতকাল সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালি পার হতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনুমতির প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের একজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা।

এ ছাড়া বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন পতাকাধারী জাহাজসহ সব বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পারাপারের অনুমতি পাবে, তবে নৌবাহিনীর জাহাজগুলো এই অনুমতি পাবে না।

পাকিস্তান যাওয়ার ইঙ্গিত

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও আলোচনার টেবিলে বসাতে মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। এ ছাড়া ইরান সফরে রয়েছে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। এই দুই দেশ ছাড়াও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়, এই যুদ্ধবিরতির আলোচনা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’

চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য পাকিস্তানে যেতে পারেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যেতে পারি, হ্যাঁ। যদি ইসলামাবাদে চুক্তি স্বাক্ষর হয়, তাহলে আমি যেতে পারি।’ এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে (রোববার) ইসলামাবাদে এই আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের কোনো তারিখ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি।

এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরসহ ‘প্রায় সবকিছুতে রাজি হয়েছে’। তবে এ নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান গতকাল আবারও বলেছেন, ইরান পারমাণু অস্ত্র চায় না।

কমল তেলের দাম

ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়া এবং এর জেরে ইরান হরমুজ খুলে দেওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, গতকাল অপরিশোধিত তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১১ শতাংশ কমেছে। গতকাল এই তেলের দাম ৮৮ ডলারে নেমেছে। এ ছাড়া টেক্সাস ক্রুডের দাম গতকাল ১০ ডলার কমে ৮৩ ডলারে নেমে আসে।

যুদ্ধ শুরুর আগে তেলের দাম ছিল ৭০ ডলারের ঘরে। এরপর দাম বাড়তে শুরু করে। হরমুজ বন্ধ করে দেওয়ার পর এই দাম ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। রয়টার্স বলছে, হরমুজ খুলে দেওয়ায় গত ১১ মার্চের পর তেলের দাম এত কমল।

হরমুজ নিয়ে আরেকটি সুসংবাদ দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরানের ঘোষণার পর তিনি বলেছেন, ওই প্রণালি থেকে মাইন সরানো শুরু হয়েছে। ইরান এই কাজ করছে। এতে সাহায্য করছে যুক্তরাষ্ট্র।

হরমুজ খুলে দেওয়ায় বিভিন্ন দেশের নেতারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে স্বাগত জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে গতকাল ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের পূর্ণ ও স্থায়ী স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা একটি জরুরি ও যৌথ অগ্রাধিকার।

সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই সিদ্ধান্ততে স্বাগত জানিয়েছেন।

হরমুজ খুলে দিলেও পার হতে লাগবে আইআরজিসির অনুমতি—আরও যেসব শর্ত

ইরানের নিউক্লিয়ার ডাস্ট কী, ট্রাম্প কেন তা সরিয়ে নিতে চান

হরমুজ প্রণালি ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’ ঘোষণা করল ইরান

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি চূড়ান্তে লাগতে পারে ৬ মাস

হামলার ক্ষয়ক্ষতি দ্রুতই কাটিয়ে উঠেছে ইরান, এখনো পাল্টা আঘাতে সক্ষম

অবরোধের মধ্যে প্রথম হরমুজ পেরোল তেলভর্তি ট্যাংকার, গন্তব্য পাকিস্তান

নতুন শত্রু খুঁজছে ইসরায়েল, তালিকার শীর্ষে পাকিস্তান-তুরস্ক

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠক আগামী সপ্তাহের শেষে, ইসলামাবাদে আসতে চান ট্রাম্প

যুদ্ধবিরতি আরও দুই সপ্তাহ বাড়াতে পারে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজ প্রণালিতে কী ধরনের মাইন পেতে রাখতে পারে ইরান