যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গতকাল বুধবার দুই দেশের প্রেসিডেন্টদের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি প্রকাশ করেছে। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে করা এই চুক্তির পরও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, ইরান চুক্তির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আবারও হামলা শুরু হবে এবং ইরানি কর্মকর্তাদের হত্যা করা হতে পারে। খবর রয়টার্সের।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানে হামলার পক্ষে আগে দেওয়া নিজের অন্তত একটি অবস্থান থেকেও সরে আসেন। তিনি বলেন, তেহরানের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকা ‘অন্যায্য’ হবে না। যদিও এর আগে তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘তারা যদি চুক্তি লঙ্ঘন করে, তাহলে আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব। আমি সেটা চাই না। আমি চাই তারা চুক্তি মেনে চলুক।’ ইরানের জনগণকে ‘বুদ্ধিমান মানুষ’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচকরা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করছেন এই প্রক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনবে এবং বৈশ্বিক তেলের দাম কমাতে সহায়তা করবে। এর আগে ট্রাম্প আরও বলেছিলেন, ‘যদি আমার পছন্দ না হয়, যদি তারা ঠিকমতো আচরণ না করে, তাহলে আমরা আবার ফিরে গিয়ে তাদের মাথার ঠিক মাঝখানে বোমা ফেলব।’
অন্যদিকে, ইরানের নেতারা ট্রাম্পের নতুন হুমকির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। বরং তাঁরা ঘটনাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত হিসেবে উদ্যাপন করেছেন। ইরান এমন কিছু ছবি প্রকাশ করেছে, যাকে ১৯৭৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথমবারের মতো কোনো মার্কিন ও ইরানি প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরিত চুক্তির দলিল বলে মনে করা হচ্ছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ‘সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করতে চেয়েছিলাম, আলোচনার মাধ্যমে আমরা তার চেয়েও বহু গুণ বেশি পেয়েছি। এর তুলনাই চলে না।’ তিনি জানান, এই চুক্তির অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদও অবমুক্ত করা হবে।
এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং একাধিক সামরিক নেতাকে হত্যা করা হয়। পরে সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়। এতে সাক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই ইরান ও লেবাননের বাসিন্দা। এ ছাড়া যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়েছে, নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বড় ধরনের খাদ্য সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
১৪ দফার এই অন্তর্বর্তী চুক্তিতে এপ্রিল মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হয়েছে। লেবাননকেও এর আওতায় রাখা হয়েছে, যাতে দুই পক্ষ চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার সুযোগ পায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় প্রস্তুত করা স্মারকে ডিজিটাল স্বাক্ষর করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বুধবার থেকেই চুক্তিটি কার্যকর হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে ভার্সাই প্রাসাদে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যোগ দেওয়ার ঠিক আগে ট্রাম্প চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। ঐতিহাসিক এই ভার্সাই প্রাসাদেই একসময় সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।