ইরানের ওপর এক অন্যায্য যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। আর ইরানের পাল্টা আক্রমণে উপসাগরীয় দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন যুদ্ধের সম্মুখসমরে (ফ্রন্ট লাইন) পড়ে গেছে এবং তারা এখন ক্ষুব্ধ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার প্রতিশোধ নিতে ইরান আরব প্রতিবেশীদের ওপর শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল এসব দেশের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, তবে একইসঙ্গে কিছু বেসামরিক নাগরিক এবং জ্বালানি অবকাঠামোও হামলার শিকার হয়েছে।
এর মাধ্যমে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের সেই ভাবমূর্তিকেই আঘাত করছে, যা ভ্রমণ, পর্যটন এবং অর্থায়নের একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। পাশাপাশি এটি এই অঞ্চলের মূল চালিকাশক্তি তেল ও গ্যাস শিল্পকেও বাধাগ্রস্ত করছে। এটি এমন এক যুদ্ধ যা আরব সরকারগুলো চায়নি এবং তারা এটি ঠেকানোর চেষ্টাও করেছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, তারা কি ইরানের এই ‘বিশ্বাসঘাতকতামূলক’ হামলার কারণে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে কি না।
গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল আনসারি বলেন, ‘সব ধরনের রেড লাইন (চরমসীমা) ইতিমধ্যে অতিক্রম করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অবকাঠামোতে হামলা হচ্ছে, আমাদের আবাসিক এলাকায় হামলা হচ্ছে এবং এই হামলার প্রভাবগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। যখন সম্ভাব্য প্রতিশোধের কথা আসে, তখন আমাদের নেতৃত্বের সামনে সব পথই খোলা আছে। তবে আমাদের এটি খুব স্পষ্ট করে বলতে হবে যে, এ ধরনের হামলা জবাবহীন থাকবে না এবং থাকতে পারে না।’
বেশিরভাগ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় ভূপাতিত করা হচ্ছে, তবে উপর থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষের কারণে আগুন লাগছে এবং মানুষ মারা যাচ্ছে। যেসব ড্রোন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে সহজে ঢুকে পড়ছে, সেগুলো বড় ধরনের ক্ষতি না করলেও এমন এক বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে যা বাণিজ্য ও ভ্রমণে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
বোঝা যাচ্ছে এটিই ইরানের কৌশল—তাদের আরব প্রতিবেশীদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে দেওয়া, যাতে তারা এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্য ও পর্যটন কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর ইরান ইসরায়েলের সমান সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস শিল্পকে ইরান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে—এতে বিঘ্ন ঘটলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। তবে এর অর্থ হলো, তেহরানের এই কৌশল হিতে বিপরীতও হতে পারে। ইরান এই পদক্ষেপের মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলোকে ওয়াশিংটনের আরও কাছে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে, এমনকি তারা কোনো না কোনোভাবে এই যুদ্ধে সরাসরি অংশও নিতে পারে।
এখন পর্যন্ত তারা ইরানের ওপর হামলা চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা বা ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকার করে আসছে।
কিন্তু এই পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। কোনো এক পর্যায়ে তারা সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিতে পারে। তারা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি—আপাতত আরবরা কেবল প্রতিরক্ষার দিকে মনোনিবেশ করছে। তবে অনেক কিছুই নির্ভর করছে এই যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তার ওপর। অনেকেই এই দ্বন্দ্বে ইসরায়েলের পক্ষ নিতে অনিচ্ছুক হতে পারেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জবাবে গাজায় ইসরায়েলের প্রাণঘাতী ও ধ্বংসাত্মক অভিযান এবং লেবানন ও সিরিয়ার মতো দেশগুলোতে তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ আরবদের সঙ্গে সম্পর্ককে ক্রমবর্ধমানভাবে তিক্ত করেছে। গত বছর হামাস নেতৃত্বকে হত্যার প্রচেষ্টায় ইসরায়েল যখন কাতারে বোমা হামলা চালিয়েছিল, তখন তারা ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল।
তবে যা পরিষ্কার তা হলো, ইরানের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করেছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয় সদস্য দেশ—সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান—গত রোববার এক জরুরি অধিবেশনে বসে। সেখানে তারা সংহতি প্রকাশ করে এবং ‘তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে এবং তাদের ভূখণ্ড, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় আগ্রাসনের জবাব দেওয়ার পথসহ প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়ার’ অঙ্গীকার করে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সিনিয়র কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ ইরানকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে শেয়ার করা এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘আপনাদের যুদ্ধ আপনাদের প্রতিবেশীদের সাথে নয়। বিচ্ছিন্নতা এবং উত্তেজনার বলয় আরও প্রশস্ত হওয়ার আগেই নিজের পরিমণ্ডলে ফিরে আসুন এবং যুক্তি ও দায়িত্বের সাথে প্রতিবেশীদের সাথে আচরণ করুন।’