হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

দুই ইসরায়েলি ভাইয়ের কৌশলে হচ্ছে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ছবি: সংগৃহীত

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল করে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন ইসরায়েলি দুই ভাই এলিয়াভ ও হারেল ‘কোকো’ লিবি। তাঁদের মালিকানাধীন লিবি কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রতিষ্ঠান পশ্চিম তীরের অবৈধ ইহুদি বসতিগুলোর জন্য দ্রুত স্থাপনযোগ্য ভবন তৈরি করছে। সংবাদসংস্থা রয়টার্স-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত কয়েক বছরে তারা অন্তত ৯টি নতুন কৃষিভিত্তিক বসতি স্থাপনে সহায়তা করেছেন।

এসব বসতি সাধারণত এক-দুটি প্রিফ্যাব্রিকেটেড ঘর দিয়ে শুরু হয়। পরে সেখানে তরুণ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা গবাদিপশু নিয়ে গিয়ে চারণভূমি দখল করেন। ইসরায়েলি আইনের দৃষ্টিতেও অনুমোদনহীন এসব ‘আউটপোস্ট’ অবৈধ। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের আমলে এগুলোর দ্রুত বিস্তার ঘটছে।

ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন পিস নাও-এর হিসাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পশ্চিম তীরে ১৮৪টি নতুন অনুমোদনহীন বসতি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে গত বছরই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৮৬টি। বর্তমানে মোট আউটপোস্টের সংখ্যা প্রায় ৪১০। রয়টার্স সরেজমিন পরিদর্শন ও স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৩০টি নতুন বসতির তথ্য যাচাই করেছে।

জাতিসংঘ ও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ পশ্চিমতীরে ইসরায়েলি বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে। অন্যদিকে ইসরায়েল ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অধিকারের যুক্তিতে এ অবস্থানের বিরোধিতা করে।

লিবি ভাইদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যাকাণ্ড বা অগ্নিসংযোগে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে তাদের প্রতিষ্ঠিত বসতিগুলোর আশপাশে ফিলিস্তিনিদের ওপর সহিংসতা ও উচ্ছেদের অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১৬ ফিলিস্তিনি নিহত ও ১,১০০-এর বেশি আহত হন। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২৩ জন এবং আহত হয়েছেন এক হাজারের বেশি।

রয়টার্সের হিসাবে, ২০২২ সাল থেকে লিবি-সংশ্লিষ্ট বসতিগুলোর আশপাশের এলাকা থেকে অন্তত ৪৩৪ জন ফিলিস্তিনি, যাদের অধিকাংশই বেদুইন পশুপালক, ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

লিবি ভাইদের সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁদের প্রতিষ্ঠান সরকারি কৃষি অনুদান ও পশুচারণের অনুমতি পেয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গাজায় ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসের কাজেও তাঁদের প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়েছে। ২০২৫ সালে গাজায় ভারী যন্ত্র চালানোর সময় এলিয়াভ লিবির ১৯ বছর বয়সী ছেলে ডেভিড নিহত হন।

এলিয়াভ লিবি প্রকাশ্য বক্তব্যে পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি সম্প্রসারণকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকানোর কৌশল হিসেবে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন, গবাদিপশু, বেড়া ও রাস্তা নির্মাণের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

গত দুই বছরে ইসরায়েলি সামরিক নেতৃত্বও কৃষিভিত্তিক এসব বসতির প্রতি আগের তুলনায় বেশি সমর্থন দেখিয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এসব বসতিকে ইসরায়েলের ‘ঐতিহাসিক ভূমিতে’ নিয়ন্ত্রণ জোরদারের দেয়াল হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এদিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য লিবি ভাইদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাজ্য তাঁদের ভূমি দখল ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, বসতি সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য পশ্চিমতীরকে খণ্ডিত করে একটি স্বাধীন ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নষ্ট করা। ইসরায়েলি ডানপন্থী নেতাদের কেউ কেউ অবশ্য এটিকে পশ্চিমতীরে ‘বাস্তবিক সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার কৌশল হিসেবে প্রকাশ্যেই তুলে ধরছেন।