হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

২০ দিন ধরে ফিলিস্তিনি পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

কুসরায় অবরুদ্ধে বাড়িটি ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলি সেনারা। ছবি: এএফপি

অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের দক্ষিণে কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বাহিনীর সমর্থনে ফিলিস্তিনিদের একটি বাড়ি ঘিরে রেখেছে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা। কাতারভিত্তিক আল জাজিরার ঘটনাস্থলে থাকা সাংবাদিকদের বরাতে জানা গেছে, শনিবার অন্তত চারজন ফিলিস্তিনি ওই বাড়ির ভেতরে আটকা পড়েন। এ সময় বসতিস্থাপনকারীরা কাছাকাছি এলাকায় আগুন ধরিয়ে দেয়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, কয়েক ডজন বসতিস্থাপনকারী গ্রামে নেমে আসে। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়ে এবং ফিলিস্তিনিরা ভেতরে থাকা অবস্থায় একটি বাড়ির চারপাশে ব্যারিকেড তৈরি করে। গত এক মাস ধরে কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা ক্রমেই বেড়েছে।

গত ৯ আগস্ট থেকে অর্থাৎ, ২০ দিন ধরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা রাস আল-আইন এলাকায় তিনটি ফিলিস্তিনি বাড়ি অবরুদ্ধ করেছে। এতে পরিবারগুলো বাড়ির ভেতরে আটকা পড়েছে এবং পানি, বিদ্যুৎসহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর আগে জুলাই মাসে বসতিস্থাপনকারীরা গ্রামটির একটি মসজিদেও আগুন ধরিয়ে দেয়।

বাড়ির ভেতরে কয়েক সপ্তাহ ধরে আটকা থাকা বাসিন্দাদের একজন লুই আবু রিদি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা এখানে নিরাপদ নই। আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পাচ্ছি। বসতিস্থাপনকারীরা এখনো বাড়িটির আশপাশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং কাছাকাছি বাড়িগুলোর বাসিন্দাদেরও আক্রমণ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আরও কিছু মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনার চেষ্টা করছি। আমাদের সঙ্গে বয়স্ক মানুষ ও শিশুরাও রয়েছে।’

গতকাল শনিবার রামাল্লা থেকে প্রতিবেদন করার সময় ফিলিস্তিনি সাংবাদিক সারা আবু আল-রব আল জাজিরাকে জানান, নিজেদের পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে বাড়িতে ধাতব শিক ও জানালার সুরক্ষা ব্যবস্থা বসানোর চেষ্টা করছিলেন এমন ছয় ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলি সেনা ও বসতিস্থাপনকারীরা আক্রমণ করেছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীরা সেখানকার বাড়িগুলো লক্ষ্য করে নিয়মিত পাথর ও আগুন ধরানো বস্তু ছুড়ে মারছে।’

আল-রব জানান, অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের একজন লোয়াই আল-বাইরোটি দিনের শুরুতেই আহত হন। বাসিন্দারা তাকে জানিয়েছেন, ‘ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বসতিস্থাপনকারীদের রক্ষা করছে, নিজেদের জমিতে যাওয়ার চেষ্টা করা বাসিন্দাদের নয়।’ পরে বসতিস্থাপনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে ইসরায়েলি সেনারা ওই ছয় ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করে। কিছুক্ষণ পর অবশ্য তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানান আল-রব।

কুসরার মেয়র আবদেল আজিম ওয়াদিও আল জাজিরাকে বলেন, ঘটনাস্থলে থাকা ইসরায়েলি বাহিনী অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদেরই গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করেছিল।

ইসরায়েলি বাহিনী এলাকাটিকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওই এলাকায় প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এমনকি কুসরার প্রধান প্রবেশপথে একটি গেটও বসানো হয়েছে। গ্রামে যেতে থাকা ফিলিস্তিনিদের বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে এসব পথ প্রায়ই ইসরায়েলি বাহিনী বন্ধ করে দেয়।

আবু রিদি আল জাজিরাকে বলেন, আটকা পড়ে থাকার অনুভূতিটা ‘একটি দুঃস্বপ্ন।’ তিনি বলেন, ‘২১ দিন ধরে আমরা ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না। রাতে আমাদের জেগে থাকতে হয় এবং নিরাপত্তা ক্যামেরার দিকে নজর রাখতে হয়, কারণ ওই বসতিস্থাপনকারীরা যেকোনো সময় হামলা করতে পারে।’

তিনি জানান, বাসিন্দাদের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাওয়ার জন্য কুসরার মেয়রের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। অনুমোদন পেতে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নিজেদের বাড়িতে স্বাধীনভাবে আসা-যাওয়া করে বসবাস করার অনুমতিও নেই।’

বুধবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী রাস আল-আইন পাহাড়ের ওপরের অংশ ঘিরে থাকা তিনটি নতুন সড়ক অবরোধ স্থাপন করে। এর ফলে পাহাড়ের ওই এলাকার বাড়িগুলো নিচের এলাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শনিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, কুসরায় ‘ইসরায়েলি দাঙ্গাকারীদের’ জড়িত ‘সহিংস সংঘর্ষের’ খবর পাওয়ার পর তারা সেখানে অভিযান চালায়। বাহিনী দাবি করে, তারা বসতিস্থাপনকারীদের বাড়িটি থেকে সরিয়ে দিয়েছে এবং তাদের যানবাহন জব্দ করেছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী আরও জানায়, ‘আরও বিশৃঙ্খলা ঠেকানো এবং শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ জন্য তাদের বাহিনী এলাকায় অবস্থান করবে। এক বিরল ভর্ৎসনায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু শনিবার এক্সে লেখেন, ‘কুসরা ও জালুদ গ্রামে একদল দাঙ্গাকারীর সংঘটিত অপরাধমূলক সহিংসতার কর্মকাণ্ডের আমি কঠোর নিন্দা জানাই। তারা আইন লঙ্ঘন করছে এবং বিশ্বে ইসরায়েলের ভাবমূর্তির ক্ষতি করছে।’

নাবলুসের কাছাকাছি আরেকটি গ্রাম জালুদে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারমাধ্যম এনবিসি নিউজের একটি প্রতিবেদক দল জানায়, মুখোশ পরা বসতিস্থাপনকারীরা তাদের প্রতিবেদক দলের সদস্যদের ওপর হামলা চালিয়ে আহত করেছে। ওই দলটি যে ফিলিস্তিনি নারীর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিল, তাকেও হামলা করে আহত করা হয়।

শনিবার ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগও এসব ঘটনার নিন্দা জানান। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, ‘শাবাতের সময় কুসরার কাছে উগ্রপন্থীদের চালানো লজ্জাজনক ও অপরাধমূলক সহিংসতার আমরা কঠোর নিন্দা জানাই।’ মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, এসব কর্মকাণ্ড ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সম্পূর্ণ বিপরীত।’

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সমর্থন পাওয়া বা তাদের উপেক্ষার সুযোগে পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও কৃষিজমিতে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা কয়েক দশক ধরেই নিয়মিত ঘটনা। একই সময়ে অধিকৃত ভূখণ্ডজুড়ে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এসব হামলার তীব্রতা ও মাত্রা আরও বেড়েছে। ওই সময় দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।