মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত ও জামাতা জ্যারেড কুশনার হামাসের সঙ্গে বিরল এক বৈঠকে বসেছিলেন। বৈঠকে মার্কিন-সমর্থিত গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গতকাল রোববার মিসরে ট্রাম্পের জামাতা কুশনার হামাসের নতুন নেতা খলিল আল-হাইয়ার নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন। গত মাসে ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ জানিয়েছিল, গাজায় হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ নিয়ে একটি সমঝোতা হয়েছে।
তবে গত সপ্তাহে ইসরায়েল ট্রাম্পের ১৫ দফা পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে। ওই পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণের পাশাপাশি ইসরায়েলি সেনাদের গাজা থেকে প্রত্যাহার এবং নতুন একটি বেসামরিক ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে গাজা পুনর্গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। রোববার আট মুসলিম দেশ ইসরায়েলের এই প্রত্যাখ্যানের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন ‘বোর্ড অব পিস’ প্রথমে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে গঠিত হয়েছিল। পরে এর কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে অন্যান্য সংঘাতেও সম্প্রসারিত করা হয়।
খলিল আল-হাইয়ার সঙ্গে কুশনারের এই বৈঠককে গত বছর গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে এ পর্যায়ের প্রথম বৈঠক বলে মনে করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোর্ড অব পিসের দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ এবং যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারও বৈঠকে অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে মিসর, কাতার ও তুরস্কের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। এই তিন দেশ গাজা শান্তি প্রচেষ্টায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে।
বৈঠক নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। তবে জানা গেছে, আলোচনায় হামাসের অস্ত্রভাণ্ডার ও অস্ত্রসম্ভার ধাপে ধাপে নিষ্ক্রিয় করার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহার এবং মানবিক সহায়তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
মিসরে অবস্থানকালে কুশনার মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গেও বৈঠক করেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুশনার, ম্লাদেনভ ও ব্লেয়ার আজ সোমবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাঁদের লক্ষ্য ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া। তবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, চুক্তি বাস্তবায়নের আগে হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র হতে হবে।
গত সপ্তাহে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েল গাজা নিয়ে বোর্ড অব পিসের ১৫ দফা নথি প্রত্যাখ্যান করছে। হামাস সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত আইডিএফ কোনো সেনা প্রত্যাহার করবে না।’ এ অবস্থানের মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতম মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাকেও কার্যত চ্যালেঞ্জ করেছেন।
রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া বলেছে, ইসরায়েলের মার্কিন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। গত বছরের ১০ অক্টোবর যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, সেটি এখনো বহাল রয়েছে।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজায় বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। সর্বশেষ হামলায় গাজার খান ইউনিস ও নুসেইরাত এলাকায় ‘সন্ত্রাসীদের’ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে ইসরায়েল জানিয়েছে। ইসরায়েলের অভিযোগ, হামাস যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। জবাবে ইসরায়েল গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সেই অভিযানে এখন পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর গাজার প্রায় ১৯ লাখ মানুষ, অর্থাৎ উপত্যকাটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।