হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

গাজার গণহত্যায় লাভে আছে বড় কোম্পানিগুলো: জাতিসংঘের বিশেষ দূত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলের অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ছবি: ইপিএ

গাজায় ইসরায়েলের চলমান অভিযানে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার সমালোচনা করেছেন জাতিসংঘের এক বিশেষ দূত। তিনি অভিযোগে করেছেন, এসব প্রতিষ্ঠান গাজার ‘গণহত্যা থেকে মুনাফা অর্জন করছে’। তিনি ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপিত এই প্রতিবেদনে বিশেষ দূত ফ্রানচেস্কা আলবানিজ বলেন, ‘গাজায় জীবন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে, পশ্চিম তীরেও হামলা বাড়ছে। এই পরিস্থিতির পেছনে এক বড় কারণ হলো—এটা অনেকের জন্য লাভজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

২০২২ সাল থেকে ফিলিস্তিনে জাতিসংঘের বিশেষ দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইতালির আইন বিশেষজ্ঞ ফ্রানচেস্কা আলবানিজ। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই তিনি গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেন।

আলবানিজ বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার অভিযোগ চলছে, তবে তিনি মনে করেন এর জন্য আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করার দরকার নেই। তাঁর ভাষায়, ‘৬৩০ দিন ধরে আমি প্রতিদিন এই বিষয়টির তদন্ত করেছি। পাঁচ মাস পরেই বলতে পারি এটি গণহত্যা। এর জন্য কাউকে বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই, শুধু তথ্যগুলো যাচাই করলেই বোঝা যাবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় ৬০ হাজার মানুষকে হত্যা, বসবাসের উপযোগী জীবনধারা ধ্বংস, ৮০ শতাংশ ঘরবাড়ি ধ্বংস, পানি ও খাদ্যের অনুপস্থিতি–এই সবই গণহত্যার সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য।’

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলের অভিযানে এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ, বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ রয়েছেন।

জাতিসংঘের বিশেষ দূতের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: ‘দখলদারির অর্থনীতি থেকে গণহত্যার অর্থনীতি।’ এতে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ, ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ধ্বংসে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি সরবরাহ, অবৈধ বসতিগুলোর কৃষিপণ্য রপ্তানি এবং যুদ্ধ তহবিল বিনিয়োগের মতো কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যখন বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারগুলো তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছে, তখন বহু করপোরেট প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের অবৈধ দখলদারি, বর্ণবৈষম্য ও এখন গণহত্যা থেকে মুনাফা অর্জন করছে।’

প্রতিবেদনে আরও বলেন, ‘এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে বরফ খণ্ডের চূড়া মাত্র। প্রকৃত জবাবদিহির জন্য বেসরকারি খাত এবং সেসব সংস্থার নির্বাহীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’

আলবানিজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রয় কর্মসূচির সুবিধাভোগী। যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড মার্টিন কোম্পানির নির্মিত এই বিমানে ১ হাজার ৬০০-এর বেশি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ও আটটি দেশের অংশগ্রহণ রয়েছে। ইসরায়েলই প্রথম দেশ, যারা এটি ‘বিস্ট মোডে’ ব্যবহার করেছে এবং প্রতিবার ১৮ হাজার পাউন্ড বোমা পরিবহন করেছে।

এদিকে সোমবার যুক্তরাজ্যের হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন, ব্রিটিশ কোম্পানিগুলোর তৈরি যন্ত্রাংশ ইসরায়েলকে রপ্তানি আইনসম্মত, যদিও সেই যন্ত্রাংশ ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের’ কাজে ব্যবহার হতে পারে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। তবে লকহিড মার্টিনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ‘বিদেশি সামরিক বিক্রয় হলো, এক দেশের সরকারের সঙ্গে আরেক দেশের সরকারের চুক্তি। এ বিষয়ে আলোচনা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মাধ্যমে হওয়া উচিত।’

মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্যালান্টিরও সমালোচনা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। এটি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্বের মাধ্যমে তাদের যুদ্ধ-সম্পর্কিত কার্যক্রমে সহায়তা করছে।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেস্কা আলবানিজ। ছবি: রয়টার্সের সৌজন্যে

ফ্রানচেস্কা আলবানিজ মনে করেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এরই মধ্যে গাজায় গণহত্যার সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেছে, যা বিশ্ব সম্প্রদায়ের ওপর তা প্রতিরোধের দায় আরোপ করে। কিন্তু ইসরায়েল আদালতের আদেশ কার্যত অগ্রাহ্য করেছে এবং এর বিচারিক এখতিয়ারকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, ‘গণহত্যা চলছে, আর তাতে লাভবান হচ্ছে বহু প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত এই লাভের চক্র বন্ধ করা এবং দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা।’

তবে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ‘ল্যাভেন্ডার’ এবং ‘গসপেল’ নামের প্রোগ্রামগুলো ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে মার্কিন ডেটা অ্যানালাইটিকস প্রতিষ্ঠান প্যালান্টির। প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি মন্তব্য না করলেও আগের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলেছে, ‘এই প্রোগ্রামগুলোর সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং এদের ব্যবহারের সঙ্গে আমরা যুক্ত নই। তবে অন্য বিভিন্ন প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা মিশনে সহযোগিতা করতে পেরে আমরা গর্বিত।’ তাদের দাবি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমাতে তারা নানান পদ্ধতি অনুসরণ করে।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেস্কা আলবানিজ তাঁর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শুধু প্যালান্টির নয়, আরও কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানিকে ইসরায়েলি হামলায় পরোক্ষভাবে সহযোগিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুইডেনভিত্তিক চীনা মালিকানাধীন ভলভো তাদের ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে গাজা ও পশ্চিম তীরে ঘরবাড়ি, মসজিদ ও অবকাঠামো ধ্বংসে সহায়তা করছে। আলবানিজ বলেন, ‘মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আহ্বান উপেক্ষা করে এই কোম্পানিগুলো ইসরায়েলি বাজারে তাদের যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য মালামাল সরবরাহ চালিয়ে যাচ্ছে। এদের নিষ্ক্রিয় অবস্থান প্রকৃতপক্ষে ইসরায়েলের জবরদখলের সহায়তাকারী।’

তবে ভলভো দাবি করেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রপাতি তারা সরবরাহ করেনি, বরং সেকেন্ডহ্যান্ড বাজার থেকে কেনা হয়েছে, যেগুলোর ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। উল্লেখ্য, ভলভো ইসরায়েলি কোম্পানি মার্কাভিমের সঙ্গে একটি যৌথ উদ্যোগে বাস তৈরি করে, যার চেসিস ভলভো সরবরাহ করে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র জানান, চুক্তিতে মার্কাভিমকে প্রযোজ্য আইন এবং মানবাধিকারবিষয়ক ভলভোর নীতিমালা মেনে চলার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। তবে জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মার্কাভিম পশ্চিম তীরে কার্যক্রম চালানো কোম্পানিগুলোর তালিকায় রয়েছে। আলবানিজ বলেন, ‘যেহেতু আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মতে পশ্চিম তীর দখল অবৈধ, তাই ভলভোর উচিত অবিলম্বে ওই অংশীদারত্ব থেকে সরে আসা।’

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইসরায়েল চলমান যুদ্ধ ও এর ফলে সৃষ্ট বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং খাত তা সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ফরাসি আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও আর্থিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিএনপি পারিবাস ও ব্রিটেনের বার্কলেজ বন্ডগুলো আন্ডাররাইট করে বাজারে আস্থা ফিরিয়েছে, যার ফলে ইসরায়েল উচ্চ সুদের ঝুঁকি মোকাবিলা থেকে রক্ষা পেয়েছে। এ ছাড়া, জার্মান কোম্পানি অ্যালিয়াঞ্জের মালিকানাধীন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান পিমকো ও মার্কিন প্রতিষ্ঠান ভ্যাঙ্গার্ড ইসরায়েলি বন্ড কিনেছে।

পিমকো এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানালেও, ভ্যাঙ্গার্ড জানিয়েছে, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান সব সময় প্রযোজ্য আইন ও বিধিনিষেধ মেনে চলে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকে।’

বিশ্বের বৃহত্তম সার্বভৌম সম্পদ তহবিল নরওয়ের গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের জড়িত থাকা সত্ত্বেও গত অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলি কোম্পানিতে তাদের বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে নরওয়ের বৃহত্তম পেনশন তহবিল কেএলপি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ওশকোশ ও জার্মানির বহুজাতিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাইসেনকুরুপের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। কারণ, এই দুটি কোম্পানি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে।

এ বিষয়ে জানার জন্য ওশকোশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো উত্তর দেয়নি। তবে থাইসেনকুরুপ জানায়, তারা কেবল আইনভাবে এসব সরঞ্জাম সরবরাহ করে এবং জার্মান সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে।

আলবানিজ তাঁর প্রতিবেদনে করপোরেট অপরাধের ইতিহাস তুলে ধরেন, যেমন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের বৃহত্তম রাসায়নিক ও ওষুধ কোম্পানি আইজি ফারবেনের বিচার, যেটি নাৎসি জার্মানির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিল। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনেও বড় কোম্পানিগুলোর ভূমিকা চিহ্নিত হয়েছিল।

জাতিসংঘ ২০১১ সালে ‘ব্যবসা ও মানবাধিকার বিষয়ে দিকনির্দেশনা’ প্রকাশ করে বলেছে, কোম্পানিগুলোর উচিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি যথাযথভাবে যাচাই করা এবং ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রতিবেদনে কিছু সুপারিশ করেছেন আলবানিজ। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার আহ্বান জানান। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ও বিভিন্ন দেশের বিচার বিভাগকে অনুরোধ করেন, যেন করপোরেট নির্বাহী ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধে সহায়তার অভিযোগে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে ‘ইলেকট্রনিক্যালি’

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য চুক্তির সঙ্গে ২০১৫ সালের চুক্তির যত মিল–অমিল

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানের প্রত্যাখ্যান—যুদ্ধবিরতি চুক্তি আজ আদৌ হবে কি

রোববারই চুক্তি সই হবে—ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান আইআরজিসির

জুলাই মাসে দাফন করা হবে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিকে

হামলা না করার শর্তে ইরানকে বিপুল টাকা দিয়েছে আমিরাত, ‘ভিত্তিহীন খবর’ বলল আবুধাবি

যুদ্ধ বন্ধে ‘চুক্তির এত কাছাকাছি আর কখনোই আসেনি’ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, কী আছে এতে

চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছেন মোজতবা—দাবি ট্রাম্পের, ইরান বলছে ‘না’

ওমান সাগরে এবার হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তেল ট্যাংকার বিকল করল মার্কিন বাহিনী