ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রতি রাতে অন্তত ‘৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা’ করা উচিত এবং শুধু ‘ওই নির্দিষ্ট মুহূর্তে যারা হুমকি সৃষ্টি করছে’ তাদের মধ্যেই হত্যাকাণ্ড সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
গতকাল রোববার প্রকাশ্যে আসা এবং ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এক পডকাস্টে সাবেক ইসরায়েলি বন্দি রোম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে আলাপকালে বেন-গভির এসব মন্তব্য করেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বে হামলার পর ইসরায়েল গাজায় যে যুদ্ধ চালিয়েছে, সেই সময় ব্রাসলাভস্কি গাজায় বন্দি ছিলেন।
বেন-গভির আরও বলেন, ‘সেখানে এমন মানুষ আছে, যারা বেঁচে থাকার যোগ্য নয়। তাদের বেঁচে থাকা উচিত নয়। তারা আদৌ মানুষও নয়।’ এ সময় তিনি গাজায় ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানোর আহ্বান জানান। বেন-গভিরের এসব মন্তব্য তাঁর দীর্ঘদিনের চরমপন্থী বক্তব্য ও অবস্থানের সর্বশেষ উদাহরণ। তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং ইসরায়েলের পুলিশ ও কারা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে।
আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের দিকে এগোতে থাকা ইসরায়েলে বেন-গভিরের রাজনৈতিক প্রভাবও বেড়েছে। ব্রাসলাভস্কিকে বেন-গভির বলেন, গাজায় চলমান বর্তমান ‘যুদ্ধবিরতি’র আওতায় সামরিক হামলা কমিয়ে আনার নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনি একমত নন। তার পরিবর্তে তিনি আবারও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড শুরু করার পক্ষে মত দেন, যা শুধু সক্রিয় হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ওপর বেন-গভিরের আনুষ্ঠানিক কোনো কর্তৃত্ব নেই এবং তিনি নিজে সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে পারেন না। অবশ্য তিনি ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার সদস্য। এই মন্ত্রিসভায় সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা থাকেন এবং তারা যুদ্ধ ও নিরাপত্তানীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আলাপচারিতায় ব্রাসলাভস্কি ইসরায়েলে সম্প্রতি প্রণীত মৃত্যুদণ্ড আইনের আওতায় ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য বেন-গভিরের কাছে প্রতিশ্রুতি চান। ওই আইনের আওতায় ইসরায়েলিদের ওপর প্রাণঘাতী হামলার দায়ে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে।
ব্রাসলাভস্কি বেন-গভিরকে বলেন, ‘আমার একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ আছে। আমি সত্যিই আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে বলছি, মন্ত্রী। আমাকে তাদের ফাঁসিতে ঝোলানোর দায়িত্ব দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি দড়ি চাই না; আমি একটি বন্দুকের ট্রিগার চাই। নিজের হাতে আমি ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিটি সন্ত্রাসীকে মৃত্যুদণ্ড দেব।’
এর জবাবে বেন-গভির বলেন, ‘এটা বাস্তবায়ন করতে আমি পুরো পৃথিবী ওলটপালট করে দেব। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এটা না হওয়া পর্যন্ত আমি সবকিছু করব এবং পুরো পৃথিবী ওলটপালট করে দেব।’ আলোচনায় বেন-গভির ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে স্থায়ীভাবে চলে যেতে উৎসাহিত করার পক্ষেও কথা বলেন। একই সঙ্গে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি। ব্রাসলাভস্কিকে তিনি বলেন, ‘পুরো গাজাই আমাদের।’ এমন মন্তব্য তিনি অতীতেও বহুবার করেছেন।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের ব্যাপক, জোরপূর্বক বা পরিকল্পিতভাবে মানুষকে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য করার উদ্যোগ জাতিগত নিধন বা এথনিক ক্লিনজিং হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের ‘যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বেন-গভিরের সর্বশেষ মন্তব্য তার কয়েক দশকের চরমপন্থী অবস্থানের ধারাবাহিকতা। কৈশোরে তিনি নিষিদ্ধ জাতীয়তাবাদী কাহানিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
মন্ত্রী হিসেবে তিনি প্রাণঘাতী হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডকে নিয়মিত শাস্তি হিসেবে চালুর পক্ষে জোরালোভাবে প্রচার চালিয়েছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি বন্দিদের আটক রাখা ইসরায়েলি কারাগারগুলোর পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে আরও কঠোর ও খারাপ করার কথাও তিনি প্রকাশ্যে গর্বের সঙ্গে বলেছেন। তাঁর এই কর্মকাণ্ড ও অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞা তার কর্মকাণ্ডে কোনো গুরুতর প্রভাব ফেলেনি।